Logo

জাতীয়

সায়েন্সের প্রতিবেদন

অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব

Icon

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ১৯:৫৭

অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব

সংগৃহীত

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকা ক্রয়ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করায় সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়ে দেশে দ্রুত বাড়তে থাকে হামের সংক্রমণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ হাম আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনেরও বেশি মারা গেছে। মৃতদের অধিকাংশই শিশু। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতাল এখন রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে। কোথাও কোথাও বেড সংকটের কারণে শিশুদের মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বজুড়েই হাম নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কানাডা, ইউরোপের কয়েকটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায়ও এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সায়েন্স বলছে, টিকা নিতে অনীহা, করোনাকালে টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ায় এ রোগ ফের বিস্তার লাভ করছে।

বাংলাদেশে শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতি চার বছর পরপর সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকে। এতদিন ইউনিসেফের মাধ্যমে এসব টিকা সংগ্রহ করা হতো, যার অর্থায়নে ছিল গ্যাভি ও বাংলাদেশ সরকার।

কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের বদলে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আগেই সতর্ক করেছিল যে এতে টিকা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্সকে বলেন, বিষয়টি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন।

দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেলে টিকার মজুত শেষ হয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। হাম-রুবেলার সম্পূরক কর্মসূচি ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া হয়, একটি কর্মসূচি আবার বাতিলও করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। পরে তা দ্রুত ৫৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ২১ হাজার মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের হাম নির্মূলে দীর্ঘদিনের অর্জনকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। সংস্থাটি আরও জানায়, মিয়ানমারে যুদ্ধের কারণে টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় আঞ্চলিক ঝুঁকিও বেড়েছে।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর বলেন, টিকার সংকটের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি তিন দফা বাদ পড়ায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল হয়েছে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেন, এটি শুধু টিকাদানের ঘাটতির ফল নয়; বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে হাম যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে জরুরি কর্মসূচি দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।

এদিকে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, গত এপ্রিল থেকে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে এবং ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চলছে।

হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়কেই দায়ী করেছে।

অন্যদিকে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা সায়েন্সকে ই-মেইলে দাবি করেছেন, তার ১৫ বছরের শাসনামলে টিকাদান ছিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি এবং বড় আকারে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।

এ ঘটনায় টিকা ক্রয়ে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, আগের টিকা ক্রয়ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। সায়েন্সকে পাঠানো এক ই-মেইলে তিনি বলেন, সরকার স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিল। তবে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তিনি গভীর শোকও প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন