ছবি: সংগৃহীত
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে গণমানুষের সমস্যা-সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের সদস্যদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যু বেশি প্রধান্য পাওয়ায় জনমনে তৈরি হয়েছে হতাশা। প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের সংসদে আসলে জনসম্পৃক্ত ইস্যু কতটা স্থান পাচ্ছে?
বিশেষ করে গত ৭ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত গণমানুষের কথা গুরুত্ব কম পাওয়ায় এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
চলমান অধিবেশনে দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের নানা সংকটের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক বিতর্কই বেশি আলোচনায় এসেছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তারা মনে করছেন, বাজেট অধিবেশনে বাজেটকেন্দ্রিক বিশ্লেষণও হচ্ছে না খুব একটা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশন (জানুয়ারি ২০১৯-এপ্রিল ২০২৩) পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা ব্যয় হয়েছে।
সেই হিসাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও কাছাকাছি খরচ হচ্ছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এতো টাকা ব্যয়ে অধিবেশনে কেন সদস্যদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে অহেতুক সময় নষ্ট হবে?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় থেকেই এই গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু বিপরীতে এবারের সংসদেও গত কয়েকদিনে দেখছি, মানুষের সমস্যার থেকে ব্যক্তিগত ইস্যু বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে; যা দুর্ভাগ্যজনক। এটি মানতে আসলেই কষ্ট হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আলোচনা কম হচ্ছে; এটিও হতাশাজনক।
এবারের অধিবেশন শুরুর পর থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকায় তার ছেলেদের নামে ইউনিয়ন পরিষদ এবং পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বদলে নিজের নামে নামকরণ করায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম তার জীবিত পিতাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে দলটির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা কেনার দাবি জানিয়ে আলেচনায় এসেছেন।
এ ছাড়া বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য জেবা আমিন খানের ইংরেজি বক্তব্যে ‘কাঁচা রাস্তা’সহ বেশকিছু বাংলা শব্দ ব্যবহার করে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন।
অন্যদিকে, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত অনেক বিষয়ই সংসদে প্রত্যাশিত গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবরসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, সংসদে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে, ব্যক্তি বা স্থানীয় ইস্যুও আলোচনায় অনেক সময় আসে। কিন্তু অধিকাংশ সময় ব্যয় হওয়া উচিত জনজীবনের সংকট, অর্থনীতি, কৃষি, বাজার ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো নিয়ে। অন্যথায় জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা বেড়ে যায়।
রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এখন এসব বিষয়ে মানুষের মাঝে চলছে আলোচনা। গ্রামের চায়ের দোকান, হাট-বাজার, গণপরিবহন, অফিস-আদালত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, কর্মসংস্থানের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সংসদে এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?
গত বৃহস্পতিবার যশোরের মনিরামপুর উপজেলার দেলুয়াবাড়ি গ্রামের হাবিবুর রহমানের চায়ের দোকানে বসে কথা হয় কৃষক আশরাফ হোসের সঙ্গে। গ্রামের খেটে খাওয়া আশরাফ জানান, এবার বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে তিনি উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। লোকসান পোষাতে সরকার কৃষকের কাছ যে নায্যমূল্যে ধান কিনছেন তারও সুফল তারা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘অথচ টিভিতে সারাদিন দেখি সংসদে এমপিরা তাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নিয়ে ঝড় তুলছেন।’ তার প্রশ্ন, সংসদে এসব আলোচনায় তার মতো মানুষের লাভ কী?
একই কথা বলছেন, সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্তবর্তী ভাদিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা আক্তারুল ইসলাম। গত বুধবার স্থানীয় দক্ষিণ ভাদিয়ালি হাটে বসে আলাপকালে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কেউ আমাদের কথা সংসদে বলেন না। দ্রব্যমূল্য না কমাতে পারলে নিন্ম আয়ের মানুষ আগামীদিনে কীভাবে বাঁচবে সে আলাপও খুব একটা শুনি না সংসদে।’
একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সংকট এবং তরুণদের চাকরির অনিশ্চয়তা নিয়েও শহর-গ্রাম সর্বত্র রয়েছে উদ্বেগ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। প্রতিদিন শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনাও অব্যাহত। মাদকের বিস্তার নিয়ে সর্বত্র রয়েছে উৎকণ্ঠা। নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও উন্নতি দেখতে চান সাধারণ মানুষ।
তবে, এসব বিষয় নিয়ে সংসদে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক আলোচনা খুব বেশি চোখে পড়ছে না বলে মনে করছেন নাগরিকেরা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

