Logo

জাতীয়

রাজনীতিতে সংবিধান প্রশ্নে বিতর্ক : সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন

Icon

অ্যাড. শাহ আলম :

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ২০:২৬

রাজনীতিতে সংবিধান প্রশ্নে বিতর্ক : সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন

সংগৃহীত

দেশের রাজনীতিতে সংবিধান প্রশ্নে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে "সংবিধান সংস্কার" এবং "সংবিধান সংশোধন"- এই দুটি শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের কথা বলেনি; বরং সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সেই কাজ করার অধিকার তাদের রয়েছে।

প্রথম দৃষ্টিতে দুটি শব্দ একই অর্থ বহন করে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাংবিধানিক আইন এবং রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য বোঝা না গেলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করা যায়। অর্থাৎ সংবিধান সংশোধন একটি আইনগত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এটি বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে নির্দিষ্ট বিধান পরিবর্তনের সুযোগ দেয়।

অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার শব্দটি বাংলাদেশের সংবিধানে কোথাও সংজ্ঞায়িত নয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত ধারণা। সংস্কার বলতে অনেক সময় বোঝানো হয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো, শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কিংবা মৌলিক রাষ্ট্রীয় দর্শনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা। অর্থাৎ সংস্কার কেবল কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিস্তৃত পুনর্বিন্যাসের ধারণাও বহন করতে পারে।

এখানেই দুটি ধারণার মূল পার্থক্য। সংশোধন (Amendment) হলো বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যে পরিবর্তন, আর সংস্কার (Reform) হলো সেই পরিবর্তনের লক্ষ্য, ব্যাপ্তি এবং দর্শনের বিস্তৃত রূপ। সব সংস্কারের জন্য সংশোধন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সব সংশোধনকে সংস্কার বলা যায় না।

সংবিধানের ইতিহাসও এই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান এ পর্যন্ত বহুবার সংশোধিত হয়েছে। কখনো বিচারব্যবস্থা, কখনো রাষ্ট্রধর্ম, কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কখনো নির্বাচন ব্যবস্থা- বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সংবিধান সংশোধন করেছে। কিন্তু এসব সংশোধনের সবগুলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার বলা যায় না। কারণ অনেক সংশোধন ছিল সীমিত, আবার কিছু সংশোধন রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতও একাধিক রায়ে বলেছেন, সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করা যাবে না। অর্থাৎ সংসদ প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে পারবে, কিন্তু এমন কোনো পরিবর্তন করতে পারবে না, যা সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে বিলুপ্ত করে দেয়। এই নীতি সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

রাজনৈতিক বিতর্কের মূল জায়গাটিও এখানে। একপক্ষ মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যে থেকেই প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব। অন্যপক্ষের মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত সংস্কার প্রয়োজন। উভয় মতের পক্ষে রাজনৈতিক ও একাডেমিক যুক্তি রয়েছে। কিন্তু যে পথই অনুসরণ করা হোক না কেন, সেটি অবশ্যই সংবিধানসম্মত, গণতান্ত্রিক এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে- জনগণের ম্যান্ডেট। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে জনগণ যে দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়, তারা নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার লাভ করে। যদি কোনো রাজনৈতিক দল সংবিধান সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয় এবং সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তাহলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তারা সংশোধনী আনতে পারে। তবে সেই সংশোধনীও আদালতের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোরও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে তাদের মতামত তুলে ধরা, সংসদে বিতর্ক করা এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করার। তবে কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।

জনগণের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- সংবিধান কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। ক্ষমতাসীন দল যেমন সংবিধান মেনে চলতে বাধ্য, তেমনি বিরোধী দলও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই তাদের রাজনৈতিক দাবি উপস্থাপন করবে এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

আরো একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবিধান সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বহুবার সংশোধিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ২৭টি সংশোধনী, ভারতের সংবিধানে শতাধিক সংশোধনী হয়েছে। কিন্তু এসব সংশোধনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও যুগোপযোগী করা। তাই সংশোধন নিজেই নেতিবাচক নয়।

দেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, সাংবিধানিক কমিশন কিংবা মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা জোরদারের জন্য সংশোধন আনা হয় এবং তা সংসদীয় বিতর্ক, বিশেষজ্ঞ মতামত ও জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে। বিপরীতে, যদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ঘন ঘন সংবিধান পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা দেয়, তাহলে সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবিধান সংশোধন এবং সংবিধান সংস্কার- দুটি পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়। সংশোধন হলো একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া; আর সংস্কার হলো বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য। রাজনৈতিক বিতর্কে এই দুটি শব্দ প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পার্থক্য স্পষ্ট। জনগণেরও এই পার্থক্য জানা প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ তারা বুঝতে পারেন।

গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা হওয়া উচিত সংবিধানের কাঠামো, সংসদীয় প্রক্রিয়া, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে ব্যক্তি বা দলের ওপর নয়- টিকে থাকে সংবিধানের শাসন, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর। 

বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন