আজ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় ফখরুল, হাফিজ ও মঈন
এম ইসলাম
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৪
ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত। তবে সেই প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে দলটির শীর্ষ পর্যায়ে চলছে নানা সমীকরণ ও আলোচনা।
দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আজ শনিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। যদিও ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব মতবিনিময় করবেন বলে জানা গেছে। দলের সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিএনপির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যিনি প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, বিশেষ কোনো ক্রাইসিসে মেরুদণ্ড সোজা করে থাকতে পারবেন এবং সবক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য করবেন না এমন ব্যক্তিকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি করা উচিত। কারণ দলটির ইতিপূর্বে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। বিএনপিকে মাথায় নিতে হবে যে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকটের সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ ১৭ বছর দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া, তৃণমূলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেক নেতাকর্মী তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তবে দলীয় নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব পদেই রাখা দলের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, সংসদ, জোট ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সমন্বয়ে তার ভূমিকার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সাংগঠনিক নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানও। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে তাকে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দলের একাধিক নেতা মনে করেন, সুশাসন ও জবাবদিহির বার্তা দিতে চাইলে মঈন খানের মতো একজন নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা বিএনপির জন্য ইতিবাচক বার্তা হতে পারে। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তার বিশেষ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
পিছিয়ে নেই বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। সম্প্রতি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর দলের স্থায়ী কমিটির পথ ছেড়ে আসা হাফিজ উদ্দিনের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। স্পিকার হিসেবে তিনি চমৎকার পারফর্ম করছেন। তিনি বিরোধী দলের কাছেও আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। যে কারণে দলের হাইকমান্ড তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট বলে জানা গেছে। সেনাবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তা রয়েছে সুপরিচিতি। ইতিপূর্বে বারবার মন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার নামে দুর্নীতির তেমন কোনো অভিযোগও নেই। নানা সমীকরণে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
আলোচনায় মোশাররফ, আইরিন খানসহ আরও কয়েকজন:
রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় আরও রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। দল ক্ষমতায় এলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে এমন আলোচনা বহু আগের। দলের একটি অংশ মনে করছে, সাংবিধানিক পদের জন্য তার ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতা বিবেচিত হতে পারে। অবশ্যই তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত তার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত আসবে সেটি এখন দেখার বিষয়।
এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানকে নিয়ে কেউ কেউ আলোচনা করছেন।
দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করার চিন্তাও পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নাম এসেছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও আলোচনায় আসে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্রের ভাষ্য, নাসিমুল গণির রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ।
চমকপ্রদ নাম হিসেবে বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব আইরিন জুবাইদা খান। জাতিসংঘে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি তার পক্ষে বড় যুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিএনপির ভিতরে তার প্রার্থিতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের চাচাতো বোন হওয়ায় তাকে মনোনয়ন দিলে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বা রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়টি রয়েছে দলের হাইকমান্ডের মাথায়।
বিএনপি যে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে:
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাংগঠনিক ভারসাম্য, রাজনৈতিক বার্তা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। এ কারণেই সম্ভাব্য প্রতিটি নামের পক্ষে-বিপক্ষে নানা দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও বিচারপতি নিয়োগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বিবেচনায় প্রার্থী নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নন। তবে বিএনপি মহাসচিবকে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছেন। তিনি বারবারই কৌশলী বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর বাইরে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
জানা গেছে, শনিবারের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

