প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ইস্যু
সরকারের অবস্থানে ইতিবাচক বিশ্লেষক-রাজনীতিকরা
এম. ইসলাম
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩:২৬
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সরকার আগ্রহী হলেও সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে যাওয়ার আগে অমীমাংসিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় ঢাকা। বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত পলাতকদের ফেরত আনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের তৎপরতা বন্ধের বিষয়ে নিশ্চয়তা চাচ্ছে সরকার।
এ অবস্থায় এসব ইস্যুতে কার্যকর অগ্রগতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সরকারি অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের মতে, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মূলত কোনো আপত্তি নেই। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ, ন্যায্যতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য ও তৎপরতার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এ অবস্থায় অমীমাংসিত বিষয়গুলো পাশে রেখে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হলে দেশে তা রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা দেশের মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিও মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। ফলে এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক ও জনমনে চাপ থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান। তাই কোনো বিদেশ সফরের আগে দেশের জনগণের মনোভাব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভারত ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করলে প্রধানমন্ত্রী সফরে গেলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। বরং সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ দরকার। কিন্তু সেই যোগাযোগের আগে দুই দেশের মধ্যে যে বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি রয়েছে, সেগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলে সফরটি অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। সরকারের বর্তমান অবস্থানকে আমি বাস্তবসম্মত বলেই মনে করি।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতের লোকসভার স্পিকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এর মধ্যেই গত রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণসহ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে দিল্লির প্রতি একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ঢাকা সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে না বরং সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে চাইছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি রাজনীতির বিষয়ও রয়েছে। কোনটির প্রভাব কতটা, সেটি বলা কঠিন। তবে কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, এটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা তৈরির জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানেও অগ্রগতি দরকার। বাংলাদেশ যে নির্দিষ্ট ইস্যুগুলো সামনে রেখে সফরের পরিবেশের কথা বলছে, এটিকে কূটনৈতিক দর-কষাকষির অংশ হিসেবেও দেখা যায়। সফর না হওয়া মানেই সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়া নয়; বরং কখন সফর করলে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ফল পাওয়া যাবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।’
তবে মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের কাছে নতুন কোনো আপডেট নেই বলেও জানান তিনি।
দিল্লির এই প্রতিক্রিয়াকে সরাসরি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি ভারতের অজানা নয়। ঢাকা প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানিয়েছে এবং দিল্লি আপাতত আমন্ত্রণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ফলে দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের দরজা খোলা রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ মঙ্গলবার রাতে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ক্ষেত্রে যে ইস্যুগুলো রয়েছে, সেগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই বাংলাদেশ। আমরা সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী এবং ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্ক চাই। কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি দেখা গেলে ভবিষ্যৎ সফরের পরিবেশ আরও ইতিবাচক হবে।
এদিকে সম্ভাব্য সফর নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও প্রকাশ্যে অবস্থান জানাতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টিÑ এনসিপিÑ এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কীভাবে হবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নিরূপণ হবেÑ এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না। বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো সম্পর্ক বা সফর হতে পারে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে। তাই পুরোনো কাঠামোতে সম্পর্ক চালানোর সুযোগ নেই।
এনসিপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ডায়াসপোরা কমিটির সদস্য রাফে সালমান রিফাত বলেন, ভারতের সঙ্গে আমরা ন্যায্যতার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক চাই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে আবার তাকে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। এই পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দেশের মানুষ ভালোভাবে নেবে না। আমরা সম্পর্ক চাই, কিন্তু সেই সম্পর্ক কোনোভাবেই একতরফা স্বার্থের ভিত্তিতে হতে পারে না।
অন্যদিকে বিএনপি মনে করছে, সরকারের বর্তমান অবস্থান মূলত কূটনৈতিকভাবে একটি বার্তা দেওয়ার কৌশল।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে একটি সফট রিমাইন্ডার দিয়েছে। বার্তাটি হচ্ছে, এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না করলে আমরা এগোতে পারছি না। বিষয়টি ভারত কীভাবে নিয়েছে, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে। দেশের মানুষকে নিয়েই তো রাজনীতি। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা সরকারের মাথায় অবশ্যই রয়েছে। তবে কোনো দেশে সফর করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়Ñ বিষয়টি এমনও নয়। ভারতের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্ক উন্নত হওয়া দরকার। বাণিজ্য, জ¦ালানি, পানি ও সীমান্তসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে রাজনৈতিক আস্থা তৈরির জন্য অমীমাংসিত বিষয়গুলোতেও অগ্রগতি দরকার।
জামায়াতে ইসলামীও সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিরোধিতা করছে না। তবে শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক আসামির প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।
জামায়াতের এমপি ব্যারিস্টার নজীবুর রহমান বলেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে জামায়াত বিরোধিতা করে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। আমরা চাই এই সম্পর্ক জনগণের স্বার্থে আরও উন্নত হোক। কিন্তু খুনি ও গণহত্যাকারীদের আশ্রয় দিয়ে আবার সম্পর্ক উন্নয়ন চাওয়াটা অনৈতিক। ভারত যদি অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখায়, তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ অনেক সহজ হবে। অন্যথায় মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব আরও বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের বর্তমান অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ না করে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা। অর্থাৎ ঢাকা একদিকে দিল্লির সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এখন শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রশ্ন নয়, এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

