# গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক কয়েকদিনের মধ্যেই: অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
# বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আমাদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে
# সরকারি উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানি
# এলপিজির মূল্য মানুষের নাগালে আসবে
দেশে বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে মজুদ কমে যাওয়ায় নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমেছে বেশ কিছুদিন ধরে। ফলে জনজীবনে নেমেছে দুর্ভোগ। বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। আর্থিকভাবে এ খাত তীব্র সংকটে ভুগছিল এবং কৌশলগতভাবেও কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘এনার্জি সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ: ফ্রম ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টু এ রেজিলেন্ট এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে, বাসা-বাড়ি কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে খরচ ও ভোগান্তি। চাপ বেড়েছে খাবার হোটেলগুলোতেও। তবে লাইনের গ্যাস না পাওয়া অনেক হোটেল হয়ে পড়েছে খাবার শূন্য। গ্যাস সরবরাহ সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই সমাধান আসবে বলে আশ্বাসও দিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘জনগণের দুর্ভোগের বিষয়ে আমরা অবগত। আমরা এমন সরকার নই, যারা সবকিছু আড়াল করে একটি কাল্পনিক বয়ান তৈরি করব, যার পরিণতিতে বেলুন ফেটে যাওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।’
ড. তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। আর্থিকভাবে এ খাত তীব্র সংকটে ভুগছিল এবং কৌশলগতভাবেও কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকের যে পরিস্থিতি, তাতে পূর্বতন নীতিমালার মাধ্যমে আমাদের একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ফাঁদে ফেলা হয়েছে।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা অভিযোগ করেন, বিগত সরকার কৌশলগতভাবে দেশের জ্বালানি খাতকে চরম আমদানিনির্ভর করে গড়ে তুলেছিল। বর্তমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জনগণ, শিল্প খাত ও সার্বিক বিনিয়োগের ওপর পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ ‘জ্বালানি মিশ্রণ’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন উপদেষ্টা।
তিনি জানান, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ, পাইপলাইন সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন কূপ খননসহ বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে অধ্যাপক ড. তিতুমীর স্পষ্ট করে বলেন, শতভাগ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই কেবল কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালে এটি সম্পূর্ণ কার্যক্ষম হতে পারবে। ‘যেকোনো মূল্যে সবার আগে আমরা সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই’ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, ভিএলসি কার্গোতে সরাসরি গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হলে দেশে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। বিগত সরকার সব ক্ষেত্রে অলিগার্ক (স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী) প্রতিষ্ঠিত করে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে গ্যাস আমদানির নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে খোলা বাজারে এলপিজির মূল্য নিশ্চিতভাবেই সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার বাংলাদেশের জনগণ ও উদ্যোক্তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘এটি একটি ব্যর্থতা।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি, আর সরবরাহ রয়েছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি আসে দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ হাজার এমএমসিএফডি আসে এলএনজি থেকে।
তিনি জানান, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ব্যবস্থার জন্য অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কাঁচপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পর্যন্ত জেট ফুয়েল পাইপলাইন নভেম্বরের মধ্যে চালু হবে, যা জ্বালানি খালাসের জটিলতা ও লজিস্টিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
আবেদনকৃত গ্রাহকসহ দেশে মোট গ্যাসের ৫ হাজার ২০০ এমএমসিএফটি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, এই চাহিদা মেটানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যে নানা রকমের উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে মাতারবাড়িতে ১ হাজার এমএমসিএফটি ক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিল্ড, ওন, অপারেট, ট্রান্সফার’ পদ্ধতিতে একটি স্থল এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রে ৬০০ এমএমসিএফটি ক্ষমতাসম্পন্ন এফএসআরইউ নির্মাণে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা শেষের পথে থাকার কথা বলেন তিনি।
বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন। সেমিনারে ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজাজ হোসেন, বিআইআইএসএস-এর গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগেরঅতিরিক্ত সচিব মঞ্জুর আলম প্রধান তিনটি উপস্থাপনায় বর্তমান জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতির সার্বিক দিক তুলে ধরেন।
সেমিনারে বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মনজুর আলম প্রধানসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

