Logo

জাতীয়

আইন পেশায় প্রবেশে ৩৫ বছরের সীমা: সংস্কার, নাকি সুযোগ সংকোচন

আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের আগে প্রয়োজন যৌক্তিকতা, ন্যায়সংগত নীতি ও অংশীজনের মতামত

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২২

অ
আইন পেশায় প্রবেশে ৩৫ বছরের সীমা: সংস্কার, নাকি সুযোগ সংকোচন

আইন পেশা কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এই পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ তাই নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেশাগত স্বাধীনতা, সমান সুযোগ, মেধার মূল্যায়ন এবং বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। ৩৫ বছর বয়সের পর কাউকে আইনজীবী হতে নিরুৎসাহিত বা বিরত রাখার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই অনুষ্ঠানে তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের বিষয়েও সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন।

গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘এজিও–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’-এর দ্বিতীয় ব্যাচের সমাপনী ও তৃতীয় ব্যাচের ইন্টার্নদের বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের কথা বলেন। 

তবে আইন পেশায় দক্ষতা ও নৈতিকতার মান উন্নয়নের জন্য বয়সসীমা নির্ধারণই  সবচেয়ে কার্যকর উপায় নয়। এর জন্য প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ সনদায়ন, কঠোর পেশাগত জবাবদিহি এবং বিচারব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। 

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইন পেশায় বয়সসীমা নির্ধারণের যে উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে, তার পেছনে নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের পেশাগত বিকাশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় অন্য পেশায় কাজ করার পর কেউ অবসরের কাছাকাছি সময়ে আইন পেশায় প্রবেশ করলে আগে থেকে এই পেশায় থাকা আইনজীবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন- এমন যুক্তি মন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

কিন্তু একজন ব্যক্তি ৩৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর আইন পেশায় প্রবেশের সক্ষমতা হারান- এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন। বয়সের সঙ্গে অভিজ্ঞতা, বিচারবোধ, পেশাগত পরিপক্বতা এবং সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতার সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে। একজন তরুণ আইন স্নাতক যেমন মেধাবী হতে পারেন, তেমনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, গবেষণা কিংবা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা একজন ব্যক্তিও আইন বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দক্ষ আইনজীবী হয়ে উঠতে পারেন।

আইন পেশায় প্রবেশের শর্ত থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষাগত যোগ্যতা, নির্ধারিত পরীক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিক মানদণ্ড এবং প্রযোজ্য নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু এসব শর্ত পূরণের পাশাপাশি কেবল বয়সের ভিত্তিতে একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

বিশেষ করে যাঁরা বয়সের কারণে পেশায় প্রবেশের সুযোগ হারাতে পারেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের শিক্ষা, প্রস্তুতি ও বিনিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। নীতিনির্ধারণের লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষ আইনজীবী তৈরি করা, সম্ভাবনাময় পেশাজীবীদের জন্য অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি করা নয়।

নতুন প্রজন্মের সুযোগ ও অভিজ্ঞদের অবদান- দুটিই গুরুত্বপূর্ণ

আইন পেশায় নবীনদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আদালতে কাজ শেখা, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া, মামলা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা- এসব ক্ষেত্রে নতুনদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘ প্রস্তুতির কারণে তাঁরা পেশায় টিকে থাকতেও সমস্যায় পড়েন।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় বয়সসীমা নির্ধারণের পরিবর্তে বা তার পাশাপাশি নবীন আইনজীবীদের জন্য কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ, আদালতভিত্তিক ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নৈতিক আচরণবিধির কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে, অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ একেবারে বন্ধ করে দিলে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও সীমিত হতে পারে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার, শ্রম, পরিবেশ কিংবা প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা যথাযথ আইনগত প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর বিচারব্যবস্থায় মূল্যবান অবদান রাখতে পারেন।

এখানে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত কে কত বছর বয়সে পেশায় প্রবেশ করছেন, শুধু তা নয়; বরং তিনি আইন জানেন কি না, ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কি না এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখেন কি না।

সরকার যদি মনে করে বয়সসীমা নির্ধারণ জরুরি, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য, নীতিগত যুক্তি ও সম্ভাব্য প্রভাবের মূল্যায়ন প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে বর্তমান আইনজীবী, আইন শিক্ষার্থী, আইন অনুষদের শিক্ষক, বার কাউন্সিলের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ। ডিজিটাল যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল হয়রানি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার মোকাবিলায় কার্যকর আইন থাকা প্রয়োজন।

তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিংবা সমালোচনামূলক বক্তব্যের অধিকার যেন অযথা সংকুচিত না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ দমন এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে কোনো আইনই দীর্ঘমেয়াদে জনআস্থা অর্জন করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে আইনের ভাষা হতে হবে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। কোন কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, অপরাধ প্রমাণের জন্য কী ধরনের উপাদান প্রয়োজন, তদন্তের সীমা কতটুকু এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবেএসব বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতা, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বিচারিক তদারকির বিষয়গুলোও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিশেষত সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং দুর্নীতি বা অনিয়মের সমালোচনা যেন অযথা অপরাধের আওতায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা প্রযুক্তির সাহায্যে সংঘটিত প্রকৃত অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকতে হবে।

আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। বিতর্কিত বা অস্পষ্ট বিধানের কারণে যাতে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য খসড়া প্রণয়নের পর্যায়েই আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করা উচিত। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া জনসমক্ষে প্রকাশ এবং যথাযথ আলোচনা নিশ্চিত করা গেলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

আইন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে বিধান, নজির, আইনি ব্যাখ্যা ও তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে পরিচিত করে। কিন্তু আদালতে মামলা পরিচালনা, নথি বিশ্লেষণ, আইনি গবেষণা, যুক্তি উপস্থাপন, বিচারিক প্রক্রিয়া বোঝা এবং মক্কেলের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বাস্তব প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

এ কারণে ইন্টার্নশিপ কর্মসূচিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ তৈরির কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করা জরুরি।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির লক্ষ্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জন্য প্রতিভাবান আইন স্নাতকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়া। এ ধরনের কর্মসূচি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে আইন শিক্ষার্থীদের পেশাগত প্রস্তুতি যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারি আইনগত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ সম্পর্কেও তাঁদের বাস্তব ধারণা তৈরি হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আইন পেশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। আইনি গবেষণা, নথি পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই না করা এবং গোপনীয় নথি ব্যবহারে অসতর্কতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ, গোপনীয়তা রক্ষা এবং পেশাগত নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। প্রযুক্তি যেন আইনজীবীর বিচারবোধকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং তাঁর কাজকে আরও দক্ষ ও নির্ভুল করে তোলে- সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

মানবিক আইনজীবী গড়তে নৈতিকতার বিকল্প নেই

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে নবীন আইনজীবীদের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আইন জানা এবং আইনের প্রয়োগে দক্ষ হওয়া একজন আইনজীবীর অপরিহার্য গুণ। কিন্তু শুধু আইনের ধারা জানা কিংবা আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা থাকলেই একজন আইনজীবী প্রকৃত অর্থে সফল হন না।

আইনজীবীর কাছে একজন মক্কেল আসেন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে। অনেকের কাছে আদালতে যাওয়া মানে দীর্ঘদিনের সম্পদসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সংকট, ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন। এ পরিস্থিতিতে মক্কেলের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অযৌক্তিক অর্থ আদায়, মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।

আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নৈতিক মানদণ্ডের ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী কিংবা সাধারণ কোনো আইনজীবীর ক্ষেত্রেই নৈতিকতার প্রশ্নে দ্বৈত মানদণ্ড থাকা উচিত নয়।

একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করা জরুরি। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ, যথাযথ পরামর্শ, মামলার খরচ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং আদালতকেন্দ্রিক সেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

আইন পেশার মর্যাদা বাড়ে কেবল আইনজীবীর সংখ্যা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে নয়; বাড়ে সততা, দক্ষতা, মানবিকতা ও জনআস্থার মাধ্যমে। একজন আইনজীবী যখন নিজের পেশাগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে স্থান দেন, তখনই তিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত ভূমিকা রাখতে পারেন।

সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন অংশীজনের মতামত

৩৫ বছর বয়সের পর আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নিয়ে সরকারের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বয়সসীমা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী? কোন সমস্যার সমাধানে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? এর পক্ষে কী ধরনের তথ্য-উপাত্ত রয়েছে? বর্তমান আইনগত কাঠামোর সঙ্গে প্রস্তাবিত বিধানের সম্পর্ক কী হবে? ইতোমধ্যে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন কিংবা পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন- এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সম্পর্কও পরিষ্কার করতে হবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য আইনগত সংশোধন প্রয়োজন কি না, নাকি বিদ্যমান বিধির আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে- সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার।

সুপীম কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. মাকসুদা খানম, কেএম খায়রুল আলম এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আইন পেশায় প্রবেশের শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগততা, যুক্তিসংগততা এবং সমান সুযোগের প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না। প্রয়োজন হলে সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে বয়সসীমার সম্ভাব্য সুফল, ঝুঁকি, বিকল্প ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে অংশীজনের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হবে দায়িত্বশীল পথ।

একইভাবে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইন প্রণয়ন কিংবা সংশোধন-কোনোটিই যেন তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন না হয়। যথাযথ পরামর্শ, স্পষ্ট ভাষা এবং জবাবদিহিমূলক প্রয়োগই পারে আইনকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে।

গতকাল ঢাকার নিম্ন আদালতের বেশ কয়েকজন নবীন ও প্রবীন আইনজীবী বাংলাদেশের খবরের এই প্রতিবেদককে জানান, একটি উন্নত বিচারব্যবস্থার জন্য নবীন আইনজীবীদের সুযোগ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অবদান রাখার পথও যুক্তিসংগতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বয়সকে একমাত্র মানদণ্ড না করে দক্ষতা, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হলে আইন পেশা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

সিনিয়র আইনজীবী পিকে আবদুর রব মনে করেন, আইনমন্ত্রী যে সংস্কারের কথা বলেছেন, তার সফলতা নির্ভর করবে সিদ্ধান্তের ন্যায়সংগততা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং জনআস্থা অর্জনের ওপর। আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচারের পথ প্রসারিত করা, অযথা সংকুচিত করা নয়। আর একজন মানবিক আইনজীবী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন এমন পরিবেশ, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, নৈতিকতার চর্চা হবে এবং ন্যায়বিচারই থাকবে পেশার সর্বোচ্চ লক্ষ্য।


বাংলাদেশেরখবর/আরকে

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন