আমাদের দেশে হরহামেশাই কিছু কথা বলতে শোনা যায়। সেটা প্রতিপক্ষকে হুমকিস্বরূপ বা ঘায়েল করার জন্য। তার মধ্যে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ বহুল প্রচলিত এবং বহুল ব্যবহৃত একটি বাক্য। আর এই বাক্য থেকে শুধু আগুন শব্দটার সঙ্গে সন্ত্রাস শব্দটি যোগ করে আগুনসন্ত্রাস বা অগ্নিসন্ত্রাস বানিয়ে তা খুব কষিয়ে এবং রসিয়ে উপস্থাপন করতেন সাবেক মন্ত্রীহাসানুল ইনু। তখন দূরদর্শনে এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিয়মিতই তার ওই মুখরোচক বাক্যটি শোনা যেত এবং পত্রিকায় পড়া হতো। ওই কথা বলার যে বড় ক্ষেত্র মন্ত্রিত্ব সেই জায়গাটিতে তিনি এখন আর নেই। আর তাই সেই অনর্গল বলে যাওয়া অগ্নিসন্ত্রাস বা আগুনসন্ত্রাস অথবা নাশকতা শব্দটি আর হামেশা শোনা যায় না। মূলত বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারকে উদ্দেশ্য করেই তিনি ওই বচনটি উচ্চারণ করতেন। তবে ওই সময় যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটত না তা কিন্তু নয়। বরং হামেশাই তা ঘটে থাকত। সেটা যে অগ্নিসন্ত্রাস বা নাশকতা ছিল না তাও কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না।
বিগত দিনে আমরা অনেক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। প্রত্যক্ষ করেছি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির। কিন্তু এটা আগুনসন্ত্রাস ছিল কি না বা নাশকতা ছিল কি না তা ভালোভাবে ঠাওর করতে পারিনি। কিন্তু যেভাবে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল তাতে তো একটা সন্দেহ ছিলই। কারণ তখন বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, তারপর নিউ মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, তারপর একই দিনে চার জায়গায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসহ আরও অনেক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল- সবই কিন্তু একটা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। এটা নিছক কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না। আবার এমনও তো হতে পারে সবই কাকতালীয় ঘটনা। কোনো পরিকল্পিত বিষয় নয়। তাই এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আমরা একটা ধন্দে পড়েছিলাম- নাশকতা নাকি দুর্ঘনা।
বঙ্গবাজার পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে যাওয়া নিয়ে যুক্তি বা পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা যেতে পারে। অনেকে পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেছেন, আবার কেউ কেউ বিপক্ষে। নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবাজার যে আরও অনেক আগে থেকেই মহা ঝুঁকিতে পতিত ছিল তা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। বরং স্বীকারই করতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিগত দিনে অন্তত দশবার সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়েছিল এই বঙ্গবাজার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই সতর্ক বার্তায় কোনো গা করেনি। তাহলে দোষটি কার। কর্তৃপক্ষের কি এই বিষয়টি আমলে নেয়া উচিত ছিল না। কর্তৃপক্ষ যেহেতু বিষয়টি নিয়ে কোনো গা করেনি তাই এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে যদি কেউ নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তা যেমন সত্য হতে পারে আবার এটা সত্যিকার অর্থেই একটি দুর্ঘনাও হতে পারে। সবই নির্ভর করে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের ওপর। কিন্তু তা আজও সম্ভব হয়নি।
কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে অগ্নিনির্বাপণ দলসহ সাধারণ মানুষ ছুটে যায় দুর্ঘটনাস্থলে তাদের সহযোগিতা করার জন্যে। বঙ্গবাজারে আগুন লাগায় সেখানেও সহযোগিতার জন্যে অগ্নিনির্বাপণ দলসহ সাধারণ মানুষের ছুটে যাওয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ছুটে গিয়েছিল পুলিশও। কিন্তু দুঃখজনক সত্যি হলো, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ দলের কর্মীদের ওপর এবং পুলিশের সদস্যদের ওপর ব্যাপাকভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। কেউ কেউ এটার স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন একটা ক্ষোভের কারণে এটা হয়েছে। ধরে নিলাম একটা ক্ষোভের কারণেই এটা হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষোভটি কেন। ক্ষোভটি কিসের। অগ্নিনির্বাপণ দলের দোষটা কোথায়। আর ক্ষতিটা হলো কাদের। নাকি এখানে অন্য কোনো ঘটনা আছে যা আমরা জানি না। যেটা আগুন নিয়ে খেলা করার মতো। যা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার মতো।
নাশকতার কারণেই হোক আর অগ্নি দুর্ঘটনার কারণেই হোক বঙ্গবাজার এখন পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে গেছে। দোকানমালিকরাও নিঃস্ব হয়ে পথে বসে গেছেন। প্রশাসনিক সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। আর্থিক সহযোগিতাও কিছু করা হয়েছিল।
হাল আমলে আবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধঅরণ করেছে। কয়েক দিন আগে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ল রাজধানীর সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল বস্তি। যা মহাখালী-গুলশানের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর কড়াইলের টিনের চালের জরাজীর্ণ খুপড়ি ঘরের মাঝখানে ব্যবধান শুধু একটি লেকের। তবে এই সামান্য ব্যবধানের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনমানের আসমান-জমিন পার্থক্য। ক্ষমতার অশুভ আঁতাত ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন বেচা এই বস্তির মানুষগুলো বারবার জ্বলে-পুড়ে নিঃস্ব হন। কড়াইলের মানুষদের কাছে এই অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকবার জীবনের বিরুদ্ধে ফিরতি আঘাত।
কড়াইল বস্তির আগুন যেন এক পুরনো অতিথি, অপ্রত্যাশিত সত্ত্বেও ঘুরে ফিরে আসে, রেখে যায় ছাই, কান্না আর ক্ষত। সঙ্গত কারণে কড়াইল বস্তির নিম্নআয়ের মানুষদের হৃদয়ে আঁকড়ে থাকা আতঙ্কের নাম ‘আগুন’। আগুন যেন তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত শত্রæ, যে কখনো সতর্ক করে আসে না, শুধু সবকিছু কেড়ে নেয়। বারবার আসে এ আগুন, কিন্তু কেন আসে, কীভাবে আসে-তা থেকে যায় অজানা।
এই কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে? কারণ কী? কে বা কারা দায়ী? আগুনের খবর পেয়েও কেন ফায়ার সার্ভিস বারবার আটকে যায় পথে? আগুনের নেপথ্যে কারও কোনো গোপন উদ্দেশ্য থাকাও কি অমূলক? সরকারেরই বা কী উদ্যোগ? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না কখনোই।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু মোটাদাগে কারণগুলো উঠে আসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের তদন্তে। কিন্তু তাতে আগুন লাগা বন্ধ হয়নি, নিঃস্ব হওয়া বাসিন্দারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতেই আবারো নিঃস্ব হন। তাদের এ করুণ পরিণতি শেষ হয়েও হয় না। এ যেন প্রশ্নের পর প্রশ্ন, কিন্তু কোনো উত্তরই শেষমেশ আগুনের কালো ছাই থেকে উঠে আসে না।
মহাখালী-বনানী-গুলশানের মতো বাণিজ্যিক-অভিজাত এলাকার মাঝখানে প্রায় ৯০ একর জায়গাজুড়ে ঘনবসতিপূর্ণ এক বস্তি কড়াইল। প্রায় লাখখানেক মানুষের বসবাস এই বস্তিতে। এখানকার বাসিন্দাদের জীবিকা দিনমজুরি, ড্রাইভিং, ভাঙারি ব্যবসা, গার্মেন্টসে কাজ, রিকশা চালানো, ছোট ব্যবসা ও হকারি ঘিরে। কর্মজীবী নারী বাসিন্দাদের অধিকাংশই ছোট দোকানি, পোশাককর্মী বা বাসা-বাড়িতে কাজ করেন।
যেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় একজন মানুষের ন্যূনতম থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত প্রধান প্রায়োরিটি, সেখানে কড়াইল বস্তিতে গড়ে প্রতি ৪০-৫০ বর্গফুটে একজন মানুষের বসবাস শুধু মানবিক সংকটই নয়, অগ্নিকাণ্ডের জন্যও যেন প্রস্তুত এক মঞ্চ। একা একা দাঁড়ানো সেই ছোট্ট খুপড়িগুলো যেন অপেক্ষায় থাকে কখন দপ করে জ্বলে উঠবে। তারই যেন প্রমাণ দিতে হয় প্রতিবছর আগুনে। কখনো কখনো তো বছরে দু-তিনবারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এখানকার বস্তিবাসীর এমন একটি বছরও কাটে না বেদনাহীন।
সবশেষ মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটের দিকে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের খবর জানায় ফায়ার সার্ভিস। এবারের আগুনও মুহূর্তেই ছুটে যায় গলিঘুপচিতে, ভেঙে দেয় জীবনের কোমল বন্ধন। মোট ১৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ১৫ ঘণ্টা পর বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ সম্ভব হয়। কিন্তু ততক্ষণে জীবনের শত শত অধ্যায় পুড়ে কালো কালিতে রূপ নেয়।
বউবাজারের কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ক-ব্লক এলাকায় আগুনের সূত্রপাত। ওই অংশে হাজারখানেক ঘর ছিল। আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নির্বাপণে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও বাসিন্দারা জানান, অন্তত ১৫০০ ঘর পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া ঘর মানে শুধু টিন-কাঠের ঘরগুলোই নয়; যেন পুড়ে গেছে স্বপ্ন, স্মৃতি ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
কড়াইল বস্তির অধিকাংশ ঘরই জোড়াতালি দেওয়া। টিন, বাঁশ, প্লাস্টিক, কাঠ, কার্ডবোর্ডে তৈরি ঘর। যেসব মূলতঃ আগুনের বা অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড দাহ্য সব উপকরণ। যা আগুনকে থামতে না দিয়ে হাত ধরে দৌড়ানোর সুযোগ করে দেয়। যেন পুরো এলাকাটিই এক বিশাল শুকনো চিতা।
টিনসেড ঘরকেই কোথাও কোথাও দ্বিতল বা তিনতলায় রূপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও ৫/৭টা বড় ঘর মিলে একটি করে ওয়াশ রুম ও রান্নাঘর। যেখানে পালা করে নিত্যদিন সেরে নিতে হয় গোসল, বাথরুম ও রান্নার কাজ। তবে একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য এমন কিছু নেই যা এই বস্তিতে মেলে না। কী বৈধ কী অবৈধ। যেন টাকা হলে সবই মেলে বস্তিটিতে। তবে বারবার আগুনের কারণে গেল বছর বস্তিতে গ্যাসের লাইন সরকারিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। এখানকার বাস্তবতা এতটাই নির্মম, যেন প্রয়োজনের চাপে মানুষ নিজের ঝুঁকি নিজেই বাড়ায়।
আগুনে সব বই-খাতা পুড়ে গেছে, এক কাপড়ে বের হইছি মায়ের লগে। স্কুল ড্রেসটাও নেই। এরমধ্যে ৭ ডিসেম্বর থেকে বার্ষিক পরীক্ষা। সব এলোমেলো দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে।—স্কুল শিক্ষার্থী ইতি আক্তার বারবার আগুন লাগার ৮ কারণ: কেন বারবার আগুন কড়াইল বস্তিতে? এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে আগুন লাগার কারণ জানতে চাওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তসহ বস্তি বাসিন্দাদের কাছে। তাদের কথায় উঠে আসে অন্তত আটটি কারণ। তারমধ্যে অন্যতম—প্রথমত: অস্থায়ী, ঘন, দাহ্য গঠনের অবকাঠামো। বস্তির রাস্তা প্রায় মানুষের কাঁধের চেয়েও সরু। ঘরগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব এতটাই কম যে কোথাও কোথাও দেয়ালই যেন দেয়ালের সঙ্গে মিশে আছে। আগুন লাগলে বাতাস তাকে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দেয়। একটি স্পার্কই এখানে মুহূর্তে পুড়িয়ে দিতে পারে শতশত ঘর।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
বিকেপি/এমবি

