মিম্বর কি জীবিকার খাতা?
হলফনামায় আয়ের ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৩১
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। পেশা হিসেবে ‘ওয়াজ মাহফিল’ উল্লেখ করা হলেও তার ঘোষিত আয় ও সম্পদের অঙ্ক সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠেছে— ইসলামের দৃষ্টিতে দাওয়াত কি আদৌ জীবিকার খাতা হতে পারে?
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। নগদ অর্থ রয়েছে ২৮ লাখ টাকা, ব্যাংকে জমা ১০ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদের হিসাবে রয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের কৃষিজমি, ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা মূল্যের দুটি বাড়ি এবং ২৯ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট। অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ঋণের ঘরে স্পষ্টভাবে লেখা— ঋণ নেই।
হলফনামা অনুযায়ী, প্রার্থী তাঁর পেশাগত পরিচয় ও আয়ের উৎস হিসেবে ওয়াজ মাহফিলের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে দাওয়াত দেওয়া একটি ইবাদত, নিয়মিত আয়ের পেশা নয়। কোরআনে বারবার এসেছে— ‘আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না’; এই নীতিই দাওয়াতের মৌলিক আদর্শ।
এই তথ্য প্রকাশের পরই বিতর্ক শুরু হয় পেশার সংজ্ঞা নিয়ে। ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি আবদুর রহিম বলেন, ওয়াজ মাহফিল দাওয়াতের কাজ, যা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কোরআনি আদর্শ অনুযায়ী দাওয়াতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দাবি করা যায় না। নবীদের বক্তব্যে বারবার এসেছে— দাওয়াতের জন্য কোনো প্রতিদান প্রত্যাশা করা হয়নি। সে জায়গা থেকে ওয়াজ মাহফিলকে পেশা ও আয়ের উৎস হিসেবে তুলে ধরা নৈতিকভাবে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এখানে বিতর্কের কেন্দ্রে দুটি বিষয়। এক, ইসলামে দাওয়াতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দাবি করা যায় কি না। দুই, নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় পেশা হিসেবে এটি উল্লেখ করা আদৌ স্বচ্ছতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। আলেমদের মতে, ওয়াজ শেষে স্বেচ্ছায় দেওয়া হাদিয়া গ্রহণ করা আর দাওয়াতকে নিয়মিত আয়ের পেশা হিসেবে ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয়টি হলে আমানত ও সত্যবাদিতার প্রশ্ন ওঠে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা বলছেন আলেমরা। ওয়াজ শেষে মুসল্লিদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় দেওয়া হাদিয়া গ্রহণ করা সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও দাওয়াতকে নিয়মিত আয়ের পেশা হিসেবে ঘোষণা করলে দাওয়াতের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা কোনো সাধারণ কাগজ নয়। এটি একটি শপথনামা, যেখানে প্রার্থীর পেশা, আয় ও সম্পদের তথ্য স্পষ্ট ও নির্ভুল হওয়া বাধ্যতামূলক। পেশার প্রকৃতি নিয়ে যদি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তাহলে তা কমিশনের নজরে আসার বিষয় হতে পারে।
সমালোচকদের প্রশ্ন আরও কড়া— মিম্বরে তাকওয়া, আমানত ও সত্যবাদিতার কথা বলা হলে রাজনৈতিক জীবনে তার প্রতিফলন কতটা দেখা যাচ্ছে? ওয়াজের মঞ্চে যে নৈতিকতা শেখানো হয়, হলফনামায় তার প্রতিচ্ছবি থাকা কি প্রার্থীর দায়িত্ব নয়?
অন্যদিকে প্রার্থীর সমর্থকদের বক্তব্য, ওয়াজ মাহফিল থেকে পাওয়া সম্মানী বা হাদিয়াকে আয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করায় অসৎ উদ্দেশ্য খোঁজা ঠিক নয়। তাঁদের দাবি, সমাজের বাস্তবতায় অনেক আলেমই এভাবেই জীবন পরিচালনা করেন।
তবুও প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে— দাওয়াত কি ইবাদত হিসেবেই থাকবে, নাকি তা জীবিকার হিসাবখাতায় পরিণত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আজ শুধু মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের নয়, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে রাজনীতিতে নামা সব প্রার্থীর ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এমএইচএস


