গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
নেতৃত্ব কোনো পদবি নয়, নেতৃত্ব একটি দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে শুধু মিছিলে সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া নয়, নেতৃত্ব মানে জাতির সামনে দাঁড়িয়ে দিশা দেখানো। একজন নেতার পরিচয় হওয়া উচিত তার জ্ঞান দিয়ে, তার আচরণ দিয়ে, তার মানবিকতা দিয়ে এবং সর্বোপরি তার সততা দিয়ে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— আজকের বাংলাদেশে নেতৃত্বের এই মৌলিক ধারণাটিই যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
যে রাজনীতি একদিন ছিল আদর্শ আর আত্মত্যাগের প্রতীক, যে রাজনীতির জন্য মানুষ হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিল— আজ সেই রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ক্ষমতা ও প্রভাবের নগ্ন খেলায়। রাজনীতি আজ আর সেবা নয়, অনেকের কাছে তা ব্যবসা। আদর্শ নয়, হিসাব। মানুষ নয়, সংখ্যা।
এই রূপান্তর শুধু রাজনীতিকে কলুষিত করেনি— এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকালে সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো চিন্তার অভাব। নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের মধ্যে নেই বই পড়ার অভ্যাস, নেই ইতিহাস বা রাষ্ট্রচিন্তার চর্চা, নেই অর্থনীতি কিংবা আইনের প্রাথমিক বোঝাপড়া। রাজনীতি যেন আজ যুক্তিবোধহীন এক আবেগী যাত্রা—যেখানে উত্তেজনা আছে, সংঘাত আছে, কিন্তু নেই দৃষ্টিভঙ্গি।
ফলে কী হচ্ছে?
রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো নতুন ধারণা আসছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কিংবা প্রযুক্তি— এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা নেই। রাজনীতি তখন আর জাতিকে এগিয়ে নেয় না, বরং জাতিকে এক জায়গায় আটকে রাখে। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে এক নির্মম প্রশ্ন তোলে— এইভাবে কি আদৌ নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব?
নতুন বাংলাদেশ কাদের হাতে গড়ে উঠবে— যারা রাষ্ট্রের ইতিহাস জানে না? যারা সংবিধানের চেতনা বোঝে না? যারা আইন প্রণয়নকে বক্তৃতা মনে করে, আর বাজেটকে কেবল সংখ্যার খেলা ভাবে?
যে মানুষ রাষ্ট্রের কাঠামোই বোঝে না, সে রাষ্ট্র সংস্কার করবে কীভাবে? যে মানুষ পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেয় না, সে জাতিকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তর করবে কীভাবে?
এই প্রশ্ন আজ শুধু কোনো কলাম লেখকের নয়। এই প্রশ্ন একজন অভিভাবকের, যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এই প্রশ্ন একজন শিক্ষকের, যিনি আলোকিত মানুষ গড়তে চান। এই প্রশ্ন সেই তরুণের, যে মেধা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে জায়গা পায় না, কারণ তার পেছনে নেই টাকা বা পেশিশক্তি।
বিশ্বের যেসব দেশ আজ উন্নতির শিখরে, তাদের দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়— শিক্ষিত নেতৃত্ব কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটি একটি সচেতন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফল।
সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের বিষয় নয়— এটি জ্ঞানের বিষয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে সংসদ মানেই গবেষণা, তথ্য আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কেন্দ্র। সেখানে রাজনীতিবিদ মানে কেবল বক্তা নন, তারা নীতিনির্ধারক।
আর আমরা?
আমাদের রাজনীতিতে এখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ বড়, নীতিগত বিতর্ক ছোট। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন নয়, ক্ষমতার হিসাবই মুখ্য। এই ব্যবধানই আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে একটি সত্য আমাদের মেনে নিতেই হবে— শিক্ষিত নেতৃত্ব ছাড়া রাষ্ট্র টেকসই হয় না। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত।
অশিক্ষিত মানুষ দিয়ে হয়তো ভয়ের রাজনীতি করা যায়, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া যায় না। আইন প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ, পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ—এসব কাজ জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়। তবুও স্বাধীনতার এত বছর পর আমরা যদি অশিক্ষিত নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, তবে সেটি হবে আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় ব্যর্থতা।
এই বাস্তবতা থেকেই একটি সাহসী কিন্তু সময়োপযোগী দাবি উঠে আসে— ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সব নির্বাচিত পদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা আইনে নির্ধারণ করতে হবে—
- ইউপি সদস্য : ন্যূনতম ইন্টারমিডিয়েট
- চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর : ন্যূনতম স্নাতক
- জাতীয় সংসদ সদস্য : ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি ও রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে প্রমাণযোগ্য জ্ঞান
এই পরিবর্তন আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। মনোনয়ন-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। পেশিশক্তির বদলে যোগ্যতাকে মূল্য দিতে হবে। শিক্ষিত মানুষ রাজনীতিতে আসতে চাইলে তাকে সন্দেহ নয়— সম্মান দিতে হবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি— যেদিন জ্ঞান, সততা ও মানবিকতা রাজনীতির মূল মানদণ্ড হবে, সেদিন রাজনীতি আর আতঙ্কের নাম থাকবে না। রাজনীতি তখন হবে মানুষের আশা, রাষ্ট্র হবে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়।
সেই দিনের স্বপ্ন নিয়েই এই লেখা। কারণ এই স্বপ্ন শুধু আমার নয়— এটি একটি জাতির সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, একটি সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন
এমএইচএস

