সুনাগরিক তৈরির পথ উন্মোচন করে প্রাথমিক শিক্ষা
রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫২
ছবি: সংগৃহীত
সভ্যতার প্রধান উপাদান হলো শিক্ষা। যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। কোনো জাতি ও সভ্যতার উত্থান-পতনের সঙ্গে শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষার আলোয় মানুষ অন্ধকারকে জয় করে। অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পায়। মুক্তির পথের দিশা খুঁজে পায়। আলো-আঁধার, ভালো-মন্দ, নীতিনৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পরখ করার অন্যতম মাধ্যম হলো শিক্ষা।
শিক্ষা মানবপ্রাণের লুকায়িত পশুত্বকে অবদমিত করে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মানুষকে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অধিকারী করে তোলে। তাই শিক্ষাকে মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই জাতীয় জীবনের অগ্রগতির মূলমন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা।
শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। এ কারণেই শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। শিক্ষা যে, শুধুমাত্র একটি জাতির মেরুদণ্ড তা নয় বরং শিক্ষা মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। সুনির্দিষ্ট দর্শন ভিত্তিক শিক্ষা মানুষকে সকল প্রকার কুপ্রবৃত্তি, কুসংস্কার ও অসদাচরণ হতে রক্ষা করে আলোকিত মানুষ, সমাজ ও একই সঙ্গে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের সংবিধানে উল্লেখ আছে, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। একই সঙ্গে জন্মগত অধিকার। শিক্ষা শুধু অধিকারই নয়, জাতি গঠনের মূল স্তম্ভও বটে। এই শিক্ষা লাভে কেউ কাউকে যেমন বাধা প্রদান করতে পারে না তেমনি শিক্ষা কেউ কেড়ে নিতেও পারে না। একটি শিশু যখন প্রথম অক্ষর শেখে, তখন সে কেবল ভাষা আয়ত্ত করে না-সে শেখে পৃথিবীকে বুঝতে, মানুষকে চিনতে, নিজের ভেতরে সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে। সে কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা কোনো সাধারণ শিক্ষাস্তর নয়, এটি একটি জাতির সভ্যতা নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর।
তাই শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস-সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত যে শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা-সেটি আজ বহুধাবিভক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি। একই দেশের শিশু ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠছে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম, মাদরাসা ও এনজিও পরিচালিত স্কুল, এ যেন এক ভিন্ন মাত্রার শিক্ষা জগত যার কোনো সঠিক দিক নির্দেশনা নেই। এই বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষা আজ কেবল প্রশাসনিক একটি জটিলতা নয়, এটি সামাজিক বৈষম্য, মানগত অসমতা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য একটি গভীর চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত তিন দশকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ভর্তির হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ও উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটির বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় অধ্যয়ন করছে এবং এক লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধারায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি এবং এখানে কর্মরত শিক্ষক প্রায় চার লাখের কাছাকাছি। ভর্তির হার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে-বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত নয়, বরং এটি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত, যার ফলে শিক্ষার মান, সুযোগ ও অভিজ্ঞতায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
একই দেশের শিশুরা যখন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ করে, তখন তাদের সুযোগ ও দক্ষতার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামের অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষাসামগ্রী নেই। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা সমাজে একটি অদৃশ্য শ্রেণিবিভাজন তৈরি করছে। মানগত অসমতা ও বহুধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও সৃজনশীল শিক্ষা, কোথাও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা-এই ভিন্নতা শিক্ষার্থীদের সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। বাংলাদেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকট, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব, পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ নেই। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে।
শিক্ষকসংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব প্রাথমিক শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিক্ষার গুণগত মান অনেকাংশে নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষকের ওপর। কিন্তু অনেক শিক্ষক এখনো আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্বের অনেক দেশ প্রাথমিক শিক্ষাকে একক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করে। ফিনল্যান্ডে সব শিশু একই ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা পায়। ফলাফল-উচ্চমানের শিক্ষা, কম সামাজিক বৈষম্য ও বিশ্বসেরা শিক্ষা ব্যবস্থা। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে মূলত শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সমন্বিত এবং মানসম্মত। তাই আমাদেরকে যা করতে হবে, তা হচ্ছে- একীভূত প্রাথমিক শিক্ষানীতি গ্রহণ ও সব ধারার প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আনা জরুরি।
অন্তত পাঠ্যক্রম, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান নির্ধারণে সমন্বয় করা প্রয়োজন। সরকারি বিদ্যালয়কে শক্তিশালী করা ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষায় সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরো কার্যকর করতে পারে। স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল পাঠ্যবই ও অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব।
শিক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজেরও দায়িত্ব। অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং নাগরিক সমাজকে শিক্ষার উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে এবং সমতার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। একটি শিশুর শ্রেণিকক্ষ কেবল একটি ঘর নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের কর্মশালা। যদি সেই শ্রেণিকক্ষ বৈষম্যে বিভক্ত হয়, তবে ভবিষ্যৎও বিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সেখানে সমতার আলো জ্বলে, তবে সেই আলোই একদিন পুরো জাতিকে আলোকিত করবে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষা সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হবে আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন। যে শিক্ষায় মানবিকতা কিংবা নৈতিকতা থাকে না, সে শিক্ষা থেকে সমাজ রাষ্ট্র খুব বেশি উপকৃত হতে পারে না।
একই সঙ্গে একজন শিশুর প্রথম শিক্ষালয় যেহেতু তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার পিতামাতা সেক্ষেত্রে পরিবারকেও একজন শিক্ষার্থীর মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষালয় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি ও শিক্ষকবৃন্দকে এ ব্যাপারে কাযর্কর ভূমিকা নিতে হবে। এতে সমাজ ও দেশ হবে সমৃদ্ধশালী। মানুষ কেবলমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণীই নয়, তার একটি নৈতিক ও সামাজিক সত্তাও রয়েছে। সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে ভালোবাসে এবং সমাজ ও মানুষের প্রতি একটি দায়বদ্ধতাও সে অনুভব করে। এ কারণে মানব সন্তানকে তার নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কেও জানতে হয় এবং নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন আদর্শ, সৎ ও যোগ্য সদস্য ও নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি তাড়নাও সে অনুভব করে। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে মানব শিশুকে যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাকে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে হয় এবং নিজের ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করার লক্ষে জীবনের একটি বিরাট সময় পর্যন্ত তাকে জ্ঞান অর্জন ও আত্মগঠনের কঠোর সাধনা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত থাকতে হয়। বলাবাহুল্য, এই কঠোর অধ্যবসায় ও সাধনার মাধ্যমে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই মানব সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বিশেষত্ব ও সার্থকতা নিহিত।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

