ছবি: সংগৃহীত
প্রযুক্তির প্রতিটি বড় বাঁকবদল মানুষের মনে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক তৈরি করে। এই আতঙ্কের মূল উৎস একইÑ আমি কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছি? শিল্প বিপ্লবের সময় হস্তশিল্পীরা এই ভয় অনুভব করেছিলেন, কম্পিউটার আসার পর অফিসকর্মীরা একই প্রশ্ন করেছিলেন। আজ সেই একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে নতুন এক রূপে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামনে দাঁড়িয়ে লেখক, সাংবাদিক এবং কপিরাইটাররা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রশ্নটি সরল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর অনিশ্চয়তা- এআই কি আমাদের বেকার করে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের প্রথমেই ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। কারণ প্রযুক্তি কখনোই শূন্যে জন্ম নেয় না। এটি সবসময়ই পূর্ববর্তী পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় প্রযুক্তি কাজ কেড়ে নেয় না। বরং কাজের সংজ্ঞা বদলে দেয়।
যখন বাষ্পীয় ইঞ্জিন এলো, তখন কায়িক শ্রমের চাহিদা কমে গেলেও নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল। যখন কম্পিউটার এলো, তখন অনেক কাজ অটোমেটেড হলেও নতুন পেশার জন্ম হয়েছিল প্রোগ্রামার, ডিজাইনার, ডেটা বিশ্লেষক।
আজ এআই সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ অধ্যায়। কপিরাইটিংয়ের জগতে এই পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট। একসময় টাইপরাইটারে শব্দ বসিয়ে কপি লেখা হতো। তারপর এলো কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সার্চ ইঞ্জিন। প্রতিটি ধাপ লেখকদের কাজকে সহজ করেছে, দ্রুত করেছে এবং একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়িয়েছে। এখন এআই সেই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।
চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো কয়েক সেকেন্ডে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। যা আগে একজন লেখকের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিত। একটি হেডলাইনের জন্য যেখানে একজন কপিরাইটার দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করেন, সেখানে এআই মুহূর্তেই শতাধিক বিকল্প হাজির করতে পারে। এই জায়গায় এসে অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি কপিরাইটারদের আর প্রয়োজন থাকবে না?
প্রথম দৃষ্টিতে উত্তরটি ‘হ্যাঁ’ মনে হতে পারে। বিশেষ করে যখন আমরা দেখি, সাধারণ ব্লগ, পণ্যের বিবরণ, কিংবা এসইও-ভিত্তিক কনটেন্ট লেখায় এআই প্রায় নিখুঁত। কিন্তু এই ‘নিখুঁততা’ই আসলে এআই-এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। এআই মূলত প্যাটার্ন নিয়ে কাজ করে। এটি কোটি কোটি শব্দ বিশ্লেষণ করে শেখে কোন শব্দের পর কোন শব্দ আসার সম্ভাবনা বেশি। ফলে এটি এমন লেখা তৈরি করে, যা ভাষাগতভাবে সঠিক, গঠনগতভাবে পরিপাটি এবং তথ্যগতভাবে গ্রহণযোগ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো সৃজনশীলতা কি শুধুই সঠিক শব্দের বিন্যাস? কপিরাইটিং আসলে তথ্যের ব্যবসা নয়; এটি আবেগের ব্যবসা। একটি সফল কপি মানুষের অবচেতন মনে প্রবেশ করে, তাকে নাড়া দেয়, তাকে প্রভাবিত করে। এটি শুধু বলে না এটি অনুভব করায়। এই জায়গাতেই এআই এবং মানুষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়।
প্রথমত, এআই-এর কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই। এটি কখনো বৃষ্টির দিনে একাকিত্ব অনুভব করেনি, কোনো ব্যর্থতার কষ্ট পায়নি বা কোনো সাফল্যের আনন্দে কেঁপে ওঠেনি। এটি শুধু এই অভিজ্ঞতাগুলোর বর্ণনা পড়েছে। ফলে তার লেখায় প্রায়ই একটি যান্ত্রিক নিখুঁততা থাকে। কিন্তু সেই গভীর মানবিক অসম্পূর্ণতা থাকে না। যা একটি লেখাকে জীবন্ত করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা। একটি ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একটি সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা, লোকজ অভিব্যক্তি, উৎসবের আবেগ এসবের ভেতরে রয়েছে এমন সূক্ষ্মতা, যা কোনো গ্লোবাল অ্যালগরিদমের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা কঠিন।
একজন স্থানীয় কপিরাইটার জানেন কখন ‘আপনি’ বললে দূরত্ব তৈরি হয়, আর ‘তুমি’ বললে আপনভাব তৈরি হয়। তিনি বোঝেন ঈদের আনন্দ আর রমজানের অনুভূতি এক জিনিস নয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলোই একটি কপিকে শক্তিশালী করে তোলে।
তৃতীয়ত, নতুনত্ব। এআই পুরোনো তথ্য থেকে নতুন কম্বিনেশন তৈরি করতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে না। সৃজনশীলতার মূল শক্তি হলো প্রথা ভাঙা যেখানে কেউ এমন কিছু বলে, যা আগে কেউ বলেনি। এআই সেই জায়গায় এখনও সীমাবদ্ধ।
তাহলে কি সব কপিরাইটার নিরাপদ? একেবারেই না। বাস্তবতা হলো, এআই কিছু কাজ খুব দ্রুতই প্রতিস্থাপন করে ফেলবে। বিশেষ করে যারা কেবল তথ্য সাজিয়ে লেখেন বা যান্ত্রিকভাবে কনটেন্ট তৈরি করেন তাদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। জুনিয়র লেভেলের কনটেন্ট রাইটিং, সাধারণ ব্লগ পোস্ট, কিংবা ছোট ব্যবসার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এই ধরনের কাজের চাহিদা কমে যেতে পারে। ফলে নতুনদের জন্য এই পেশায় প্রবেশ করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে পেশাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং এটি রূপান্তরিত হচ্ছে। বাজার এখন আর শুধু ‘লেখক’ খুঁজবে না, তারা খুঁজবে ‘চিন্তাশীল নির্মাতা’ যারা কনটেন্টের পেছনের উদ্দেশ্য বোঝে, অডিয়েন্সের মনস্তত্ত্ব বোঝে এবং ব্র্যান্ডের ভাষা তৈরি করতে পারে।
এখানেই কপিরাইটারের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। এআই এই প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী সহযোদ্ধা হতে পারে। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ‘রাইটার্স ব্লক’ সাদা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা। এআই সেই বাধা ভেঙে দিতে পারে। এটি একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে দিতে পারে, যেটির ওপর লেখক নিজের চিন্তা ও অনুভূতির স্তর যোগ করতে পারেন।
এছাড়া গবেষণার ক্ষেত্রেও এআই অসাধারণ সহায়ক। আগে একটি নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তথ্য খুঁজতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডেই একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। এটি কপিরাইটারের কাজকে কমিয়ে দেয় না। বরং তাকে আরও দ্রুত এবং কার্যকর করে তোলে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এআই ব্যবহার করা এবং এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এই দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।
যদি একজন লেখক নিজের চিন্তার জায়গাটি এআই-এর কাছে ছেড়ে দেন, তাহলে তার লেখার স্বকীয়তা হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি তিনি এআই-কে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করেন। তাহলে তার সৃজনশীলতা আরও প্রসারিত হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে কপিরাইট বা মেধাসত্ত্বের প্রশ্ন।
এআই যখন কোনো লেখা তৈরি করে, সেটি আসলে কার? এই প্রশ্নের এখনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এআই এমন কিছু তৈরি করছে যা অন্য কোনো উৎসের সঙ্গে মিল রয়েছে। ফলে আইনি জটিলতার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই কারণে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এখনো সম্পূর্ণভাবে এআই-এর ওপর নির্ভর করতে সাহস পাচ্ছে না। তারা জানে, মৌলিকতা শুধু নৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি ব্যবসায়িক প্রয়োজনও।
এই প্রেক্ষাপটে মানবিক লেখার মূল্য আরও বাড়বে। যখন ইন্টারনেট এআই-জেনারেটেড কনটেন্টে ভরে যাবে। তখন মানুষ সচেতনভাবেই এমন লেখা খুঁজবে, যেখানে একটি বাস্তব মানুষের চিন্তা-অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি রয়েছে। এই পরিবর্তনটি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বড় ব্র্যান্ডগুলো এখনো মানুষকে নিয়োগ দিচ্ছে। কারণ তারা জানে, একটি শক্তিশালী গল্প বা একটি গভীর বার্তা তৈরি করতে শুধু ডেটা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিচয়ের অংশ। আমাদের আঞ্চলিকতা, আমাদের রসিকতা, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট এসবই কপিরাইটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এআই এই জায়গাগুলোতে এখনো সীমাবদ্ধ। এটি ব্যাকরণ ঠিক রাখতে পারে। কিন্তু টোনের সূক্ষ্মতা ধরতে পারে না। এটি শব্দ সাজাতে পারে। কিন্তু অনুভূতির গভীরতা তৈরি করতে পারে না।
এই সীমাবদ্ধতাই আমাদের জন্য সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করে। যদি একজন বাংলাদেশি কপিরাইটার এআই-কে টুল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের সাংস্কৃতিক বোধকে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে তিনি আন্তর্জাতিক মানের কাজ তৈরি করতে সক্ষম হবেন। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে কপিরাইটারদের কিছু বিষয় নতুন করে ভাবতে হবে।
প্রথমত, এআই-কে ভয় না পেয়ে এটিকে আয়ত্ত করতে হবে। এটি একটি টুল এবং যিনি টুলটি ভালোভাবে ব্যবহার করতে জানেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, গভীর অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করতে হবে। কেবল তথ্য জানা যথেষ্ট নয়; মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। একজন পাঠক কীভাবে চিন্তা করে, কী তাকে প্রভাবিত করে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
তৃতীয়ত, নিজের একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর তৈরি করতে হবে। এআই সাধারণত একটি ‘গড়পড়তা’ লেখা তৈরি করে। কিন্তু একজন লেখকের শক্তি হলো তার আলাদা হওয়ার ক্ষমতা।
চতুর্থত, গল্প বলার দক্ষতা বাড়াতে হবে। মানুষ তথ্য ভুলে যায়। কিন্তু গল্প মনে রাখে। একটি ভালো গল্পই একটি ব্র্যান্ডকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
সবশেষে, আমাদের বুঝতে হবে এটি কোনো শেষ নয়, এটি একটি রূপান্তর। এআই কপিরাইটিংয়ের মৃত্যু ঘটাচ্ছে না বরং এটি কপিরাইটিংকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের কপিরাইটার শুধু শব্দ লিখবেন না। তিনি কনটেন্ট পরিচালনা করবেন। তিনি এআই-কে নির্দেশ দেবেন, কাঠামো তৈরি করবেন, এবং সেই কাঠামোর ভেতরে মানবিক অনুভূতির রঙ যোগ করবেন।
দিনশেষে, সফটওয়্যার শব্দ তৈরি করতে পারে, কিন্তু অনুভূতি তৈরি করতে পারে না। মানুষের অভিজ্ঞতা, মানুষের ভুল, মানুষের দ্বন্দ্ব এই জিনিসগুলোই সৃজনশীলতার মূল উৎস। আর যতদিন মানুষ অনুভব করবে, ততদিন সৃজনশীলতার মৃত্যু হবে না। বরং প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতোই এটি আমাদের বাধ্য করছে আরও ভালো হতে আরও গভীরভাবে ভাবতে এবং আরও মানবিক হতে। এই কারণেই বলা যায় এআই সৃজনশীলতার মৃত্যুঘণ্টা নয়। বরং তার নতুন জন্মের ঘোষণা।
লেখক : কবি ও কলাম লেখক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

