‘গ্রেট আমেরিকা এগেইন’ থেকে ‘ব্যাক টু দ্য প্যাভেলিয়ন’
অলোক আচার্য
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৪১
অলোক আচার্য, সংগৃহীত
ইরান বিজয় যতটা সহজ হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন তার থেকে পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল দিকে যাচ্ছে। ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে সে আলোচনা-সমালোচনা এখন হট টপিকস। ট্রাম্প ঠিক কী ভাবছেন তা না জানা গেলেও বোঝা যায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে তিনি কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন। বলা যায়, ইরান যুদ্ধ এখন উভয় সংকট তৈরি করেছে ট্রাম্পের সামনে। যুদ্ধ থেকে হঠাৎ বের হওয়ার ঘোষণাও দিতে পারছেন না, আবার যুদ্ধ চালিয়ে গেলে নিজের এবং অন্য দেশের যুদ্ধজনিত ক্ষতি এড়াতেও পারছেন না।
নিজেদের যুদ্ধ বিমান হারিয়েছেন, গর্ব করার মতো তেমন কিছুই করতে পারেনি আমেরিকা। বরং কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালী দখলে রাখতে পারাই এখন ইরানের সবচেয়ে বড়ো সফলতা। ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ে মূল বাজিটা খেলছে। নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হরমুজ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার কিছু ঘনিষ্টদের কোনো জাহাজ চলতে দেওয়া হচ্ছে না। এতেই দেশগুলোর অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির খাঁড়া নেমে এসেছে। ফলে দেশগুলোর জনগণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করছে। জোরালো হচ্ছে যুদ্ধ বন্ধ করার দাবী। যুদ্ধ শুরু ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে হলেও এখন সেটি চলে গেছে ইরানের কোর্টে। যুদ্ধ বিরতির শর্ত সুবিধাজনক না হলে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করবে না। যুদ্ধ থাকলে হরমুজ প্রণালীও বন্ধ থাকবে। অর্থনীতি ধসে পরবে। ফলে দেশগুলো বাধ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণের প্রতিবাদ করবে। বিপরীতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করার প্রচেষ্টাও করবে কিছু দেশ। আবার খার্গ দ্বীপও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রেখেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি বেড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। তেহরান থেকে এএফপি জানায়, ইসনা সংবাদ সংস্থা ইরানের পার্লামেন্টের জ্বালানি কমিশনের প্রধান মুসা আহমাদির বরাতে জানায়, ‘খার্গ দ্বীপে সফর ও বৈঠক শেষে আমি বলতে পারি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেল রপ্তানি কমেনি, বরং বেড়েছে।’ ইরানের পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র। এখান থেকেই ইরানের অধিকাংশ তেল রপ্তানি হয়। ট্রাম্প খার্গ দ্বীপ নিজের আয়ত্ত্বে নেওয়ার কথা বলেছেন।
পুরো পৃথিবীকেই অস্থিতিশীল করে তুলেছে এই যুদ্ধ। ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন তখন স্লোগান ছিল, ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। এই ‘গ্রেট’ করতে গিয়ে তিনি হেঁটেছেন পূর্বসুরী সব প্রেসিডেন্টের উল্টোপথে। এরই মধ্যে পেয়েছেন যুদ্ধভাব প্রেসিডেন্টের তকমাও। যুদ্ধ করেছেন তার আগের প্রেসিডেন্টরাও। তবে এইবারের যুদ্ধ বা মনোভাব একটু যেন আলাদা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে এক রাতে আটক করে নিয়ে যাওয়া, সেখানকার তেলের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, ইরানের উপর হামলা এবং খার্গ দ্বীপের তেল নিয়ন্ত্রণ করা। যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করেছেন ইউরোপ থেকে এবং তার এক সময়কার ঘনিষ্ট দেশগুলো থেকেও। স্পেন তো নিজেদের আকাশসীমা ব্যাবহারের অনুমতিই দেয়নি আমেরিকাকে। যুক্তরাজ্যও যুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়নি। ফ্রান্সও এই যুদ্ধের পক্ষে নন। যুক্তরাষ্ট্রকে একাই এই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সঙ্গে অবশ্য ইসরায়েল রয়েছে। তবে বছর ধরে একইভাবে যুদ্ধ করার ফলে ইসরায়েল এখন ক্লান্ত। সেদেশের সেনাবাহিনীর ভিতরের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। মোট কথা যুদ্ধে এখন যুক্তরাষ্ট্রও একটি ‘এক্সিট’ চাইছে। সেটা কেমন হবে বলা মুশকিল। কারণ ইরান নিজের সম্মানহানী হয় এমন কোনো শর্তেই যুদ্ধ বন্ধ করবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারেও টান পরছে। গর্বের যুদ্ধ বিমানগুলো ভেঙে পরায় ট্রাম্প সম্ভবত কিছুটা বিরক্ত ও চিন্তিত। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা পূরণ হয়তো হচ্ছে না। উল্টো পৃথিবীতে অস্থিরতা তৈরি করায় তিনি নিজের দেশের জনগণেরও বিরক্তির কারণ হয়েছেন। কয়েকদিন আগেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। সম্ভবত ট্রাম্প পৃথিবীতে এমন একটি ধারণার জন্ম দিতে চেয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রর ক্ষমতা অসীম এবং চাইলেই পৃথিবীকে যেভাবে খুশি ঘোরাতে সক্ষম। সেই ধারণা থেকেই প্রথম আঘাত করা হয় অর্থনীতিতে। আরোপ করা হয় অতিরিক্ত শুল্ক। এরপর হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্পের ইরানের প্রতি হুমকি ধমকি চলতেই থাকে। মূলত ইরানের যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি রয়েছে সে ধারণা এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের। এই যুদ্ধেরও বিরতি হবে। তবে সেটা এখনই হচ্ছে না। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও চীনের কথা শোনা গিয়েছে। স্বল্প বিরতির যুদ্ধবিরতি হবে না সম্ভবত। যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ ইরান দাবী করছে সেটা যুক্তরাষ্ট্র মেনে না নেবারই কথা। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধটা আরও দীর্ঘই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যতটা সহজে ইরানকে কাবু করে নিজের আওতায় নিয়ে আসবে ভেবেছিল হয়েছে তার উল্টোটা। এই প্রথম বিশ্বের সামনে একটি সুযোগ এসেছে নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করে স্বাধীন পথ তৈরি করা।
এই পৃথিবীতে প্রতিটি দেশই কোনো না সম্পদের জন্য অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক সম্পদগুলো পৃথিবীব্যাপী বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেমন- মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে তেল। আবার এশিয়ায় কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানে ভারসাম্য আনতে হলে দরকার সম্পদের সুষম সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বন্টণ। যুক্তরাষ্ট্র যা চাইছে সেটি হলো আগামী একশ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ শক্তির প্রধান উপাদান এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি। জ্বালানি বিহীন পৃথিবী কেমন হতে পারে তার নমুনার খুব সামান্য একটি রিহার্সেল পৃথিবী দেখতে পেয়েছে। এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র যা শিখছে তা হলো, চাইলেই যে কারো উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। শক্তিশালী অস্ত্রও কৌশলের কাছে ব্যর্থ। মিত্রদের এড়িয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে মিত্ররা এগিয়ে নাও আসতে পারে। হরমুজ প্রণাীলতে মিত্রদেশগুলোকে যুদ্ধ জাহাজ পাঠাতে বললেও কেউ তা পাঠায়নি। তারা ট্রাম্পকে কার্যত একা করে দিয়েছেন যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি। পৃথিবীতে একক পরাশক্তির ধারণা এখন অচল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মতো কোনো হঠাৎ ঘটনা ঘটিয়ে বা আক্রমণ করে লক্ষ্য অর্জন করবেন। বাস্তবে পরিস্থিতি গেছে ভিন্ন দিকে। এই যুদ্ধে এখন পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। কারণ যেকোনোভাবেই হোক ইরানের নেতা ট্রাম্পের ঘনিষ্ট হতে হবে- আভাসটা এরকমই। ট্রাম্পের ইরানকে নরকে পরিণত করার যে হুমকি সেটি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের দিকেই ইঙ্গিত করে। জনসমর্থন ছাড়াই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে নিয়ে গেছেন। তবে জনসমর্থনের বিষয়টি মূলত কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যদি এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে বিজয়ী হয় তাহলে জনগণ যুদ্ধকে অপছন্দ করলেও নিজেদের লাভটা ঠিকই দেখবে। তখন সমর্থনও পাল্টাবে। যদি এর উল্টো হয় তাহলে সমর্থনও হবে উল্টো। আগামী নির্বাচনে জনগণের সামনে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য ছাড়াই হাজির হলে তার দলও সংকটে পরতে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধ বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড়ো ধরনের শিক্ষা নিতে পারবে। সঙ্গে ইসরায়েলও। যুক্তরাষ্ট্রের মনে ফিরে আসবে ভিয়েতনামের স্মৃতি! এই যুদ্ধ বিরতিতে চীন ও রাশিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চলায় রাশিয়ার চেয়ে চীন বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চাইলে ভারতও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামন আসতে পারে। কারণ ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশেরই মিত্র। সম্প্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনায় নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার ইরানও হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। সব থাকা সত্ত্বেও সেই যুদ্ধে তার পরাজয়ের ইতিহাস।
আমরা চাই এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হোক। পৃথিবীতে ক্ষমতার ভারসাম্য আসুক। কোনো দেশের ক্ষমতার পরিবর্তন করবে সেই দেশের জনগণ, কোনো পরাশক্তি নয়। এই ধারণাই দৃঢ় হোক এই যুদ্ধ শেষে। কোনো দেশ এককভাবে আর আধিপত্য না দেখাক। অন্তত ইরান যুদ্ধ দিয়েই শেষ হওয়া উচিত এই ধরনের উগ্র মানসিকতা। আমেরিকাকে ‘গ্রেট’ করতে গিয়ে ট্রাম্প যেন দেশটিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছেন। এর দায় ট্রাম্পকেই বহন করতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

