ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ইউটিউবে নজরুল ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, লেখক এবং সরকারের যুগ্ম-সচিব মো. জেহাদ উদ্দিনের একটি একটি বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে নজরুল ইন্সটিটিউটের আয়োজনে তিনি প্রধান বক্তা হিসেবে কথা বলছিলেন। সেখানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ধানমণ্ডি লেকের নতুন নামকরণের দাবি উত্থাপন করেছেন।
ফেসবুকে একই বিষয়ে এক পোস্টে ইন্সটিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক জানিয়েছেন যে তিনিও এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু সিটি করপোরেশন কর্ণপাত করেনি।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর ১৫ বছর পর ঢাকায় গোড়াপত্তন হয় ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকার। আর যাকে আমরা ধানমণ্ডি লেক নামে চিনি সেটি ছিলো পাণ্ডো খাল, কারওয়ান নদীর শাখা, প্রায় মৃত।
লেকটি ধানমণ্ডি ২ থেকে শুরু করে ২৭ পর্যন্ত বিস্তৃত। ৬০ দশকের শেষের দিকে ধানমণ্ডিতে বাড়ি করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লেখক বদরুদ্দীন উমর এ প্রসঙ্গে বলেন, মুজিব বাড়ি করার পর ধানমণ্ডি আওয়ামী লীগের কলোনিতে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, বদরুদ্দীন উমর মিরপুর রূপনগরে থাকতেন।
ধানমণ্ডিতে বিখ্যাত বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত বসবাস করেছেন। অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে এই আবাসিক এলাকা শুরু হওয়ার ১৬ বছর পর নজরুল এখানে চরণ রাখেন। এ ছাড়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাড়ি করেছিলেন ৭ এ, যা পরে তার ছেলে রবার্ট এশবি (রাশেদ সোহরাওয়ার্দী) বিক্রি করে দেন। যদিও সোহরাওয়ার্দী ভবন নামেই এখনো পরিচিত বাড়িটি। সেখানে Bangladesh Institute of Law and International Affairs নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় নজরুল গেজেটবিহীন জাতীয় কবি ছিলেন প্রায় ৫০ বছর। ইউনূসের ইনটেরিম সরকারের আমলে তিনি গেজেটভূক্ত হয়েছেন। বর্তমানে জাতীয় কবি হিসেবে তিনি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। এর আগে ছিলেন মুখে মুখে ‘জাতীয় কবি’। এদিকে ধানমণ্ডি লেকের নাম পরিবর্তন করে নজরুলের নামে করতে হলে সিটি করপোরেশন, সার্বভৌম সংসদ এবং ঢাকা জেলা পরিষদ সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জাতীয় কবিকে কেমন করে সম্মান জানাতে হয় সেটি কিউবা দেখিয়েছে। সেদেশের জাতীয় কবি হোসে মার্তির সমাধি একটি জাতীয় স্থাপনা, যেখানে সেনা সদস্য নিয়মিত গার্ড অফ অনার প্রদান করে থাকে।
বাংলা ভাষার জাতীয় কবি নজরুল নিজে ব্রিটিশ আর্মির সদস্য ছিলেন এবং হাবিলদার পদে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ভারত উপমহাদেশের আর কোনো সেনা সদস্য কবি হিসেবে এমন মর্যাদায় অভিষিক্ত হননি, যা কবি নজরুলের ভাগ্যে ঘটেছে। বস্তুত এটি বিশ্বে বিরল। তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে গার্ড অফ অনার প্রাপ্য ছিলো।
নজরুল জাতীয় কবি। তাই তিনি সকল মানুষের কবি। সবাই তাকে নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। রুটির দোকানের কর্মী থেকে মসজিদের ইমাম পর্যন্ত তাকে নিয়ে কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে পিয়ন পর্যন্ত কথা বলেন কবিকে নিয়ে। ভালোবাসা এতো তীব্র যে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারকে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলি, যখন নজরুলের বয়স মাত্র ১৪ বছর!
নজরুল ইন্সটিটিউট কবির সঙ্গীত নিয়ে যতটা নিমগ্ন, নজরুলের পুরো সৃষ্টি নিয়ে ততোটাই নির্লিপ্ত। কবির অন্যান্য রচনা নিয়ে সেখানে কোনো গঠনমূলক প্রকল্প নেই; নেই গবেষণা। নেই চিনের কনফুসিয়াস ক্লাসরুমের মতো কোনো সেল।
নজরুলের আদি রেকর্ডের শিল্পীদের মধ্যে অনেকের আলোকচিত্র আমাদের সংগ্রহে নেই। ইন্সটিটিউটের সংগ্রহে কি আছে? নজরুল তার জীবনের শেষ কয়েক বছর ধানমণ্ডিতে বাস করেছেন। যদিও বেশির ভাগ সময় পিজি হাসপাতালেই ছিলেন। সেসময় কবি ভালোমন্দ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি এক জীবন্মৃত অবস্থায় ছিলেন, বাকশক্তি রহিত। সাহিত্য ও সঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষমতা হারিয়েছেন বিয়াল্লিশেই। সরকারের একজন আমলা কবির এই বাড়ি নিয়ে কী তুঘলকি কাণ্ড করেছেন সে কথা নাইবা তুললাম।
কবির সামগ্রিক রচনা এবং সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অবদান নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ আছে। তার উদারনৈতিক মননের উপর আরো আলোকসম্পাত করা জরুরি। নজরুল কেবল ধানমণ্ডি লেক বা ধানমণ্ডিতে সীমায়িত নন, তিনি সকল দেশের সকল যুগের এবং সকল মানুষের। ধানমণ্ডির বাসিন্দা হিসেবে এই সম্মান নজরুলের প্রাপ্য।
লেখক: নজরুল-কর্মী, কিউরেটর।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

