Logo

মতামত

মেধাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা বিনির্মাণে সংস্কার প্রস্তাবনা

Icon

আবু হানিফ

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১৬:৫৭

মেধাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা বিনির্মাণে সংস্কার প্রস্তাবনা

আবু হানিফ, ছবি: সংগৃহীত

‘একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সৎ, দক্ষ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক নাগরিক ও মানসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সংস্কার করে শিক্ষককে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দাও; শিক্ষক রাষ্ট্রকে উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি এবং যুগোপযোগী মানবসম্পদ উপহার দিবে’Ñ এই প্রত্যাশা ও উচ্চাকাক্সক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করে শিক্ষা ব্যবস্থার মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের অপরিহার্য দাবি বলে মনে করি।

শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন ও মূলভিত্তি মজবুত করতে প্রাথমিক শিক্ষা  ব্যবস্থায় ইতিবাচক ও যৌক্তিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায়  বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে স্ব-স্ব ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক মূল্যমান এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব,  অখণ্ডতা এবং দৃঢ়তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেরণাদানকারী আদর্শ-ই জাতীয় আদর্শ হিসেবে রূপদান আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি বলে মনে করি। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে গণমানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রতিফলন ঘটানোর  মানসকল্পে সংস্কার প্রক্রিয়ায় কী এবং কেন সংস্কার প্রয়োজন তা সুস্পষ্টভাবে জানা দরকার। যেকোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত হয়। আর এই নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিধিমালাতে লিপিবদ্ধ থাকে।

তাই বুঝাই যাচ্ছে, প্রচলিত পদ্ধতি ও কাঠামোকে পুনর্গঠন ও সংস্কার করতে সর্বপ্রথম বিধিমালা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন ও সংশোধন করা অপরিহার্য। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে শিক্ষা  ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনয়নকল্পে  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৩, ১৯৯১, ২০১৩, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাই বর্তমান বাস্তবতায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের জন্য নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তন করা জরুরি। নিয়োগ বিধি পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায়  বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে মনে করি। নিয়োগ বিধিতে যা যা পরিবর্তন, সংযোজন ও  বিয়োজন প্রয়োজন তা বিশদভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালাচ্ছি। 

১.  প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নকল্পে প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত জনবল সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য কমিশনের কাজের পরিধি বৃদ্ধি করে তার কার্যাবলি যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে স্বতন্ত্র ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা একান্ত প্রয়োজন।

২. সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে শূন্য পদের ভিত্তিতে উপজেলা বা ক্ষেত্রমতে থানাভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি বাতিল করে সম্পূর্ণ জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান এবং শূন্য পদ থাকা সাপেক্ষে নিজ উপজেলা, জেলা, বিভাগের মধ্যে কিংবা প্রয়োজন সাপেক্ষে দেশের যেকোনো প্রান্তে পদায়ন ব্যবস্থা করলে আগামী প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে।

৩. সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রিলিমিনারী ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই প্রক্রিয়া পদ্ধতি বাতিল করে প্রিলিমিনারী, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়া চালু করলে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষক নির্বাচন করা সহজ হবে। 

৪. সরকার কর্তৃক গঠিত সংশ্লিষ্ট বাছাই বা নির্বাচন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতির পরিবর্তে কমিশন কর্তৃক পরিচালিত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মাধ্যমে স্ব্যংক্রিয় পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করলে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষক যথোপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা পাবে। 

৫. উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে চাইলে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক মুক্তি  নিশ্চিতের মাধ্যমেই কেবল শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব এবং উন্নত বিশ্বের মানদণ্ডের   ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মেধাবীদের এই সেক্টরে আকৃষ্টকরণের নিমিত্তে শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রসরমান দেশগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সরকারে একান্ত দায়িত্ব বলে মনে  করি।

৬. উপজেলা ভিত্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। যেহেতু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সকল চাকুরিতে জেলা কোটা বাতিল করেছে সেহেতু উপজেলা কোটা থাকার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না।

৭. ক্যাটাগরি ভিত্তিক কোটা পদ্ধতি এবং বিভাজন ও বণ্টন পদ্ধতি বাতিল করে আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। 

৮. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ এর তপশিলে [বিধি ২(গ)] বর্ণিত বিধানাবলী সংশোধন করে একাডেমিক পদমর্যাদা কাঠামো এবং প্রশাসনিক পদমর্যাদা কাঠামো নামক শিরোনামে নিম্নোক্ত প্রক্রিয়ায় বর্ণিত হতে পারে।

একাডেমিক পদমর্যাদা কাঠামো: ক. শিক্ষক: কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএ সহ স্নাতক বা স্নাতক(সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের তিন ধাপে (প্রিলিমিনারি, লিখিত, ভাইভা) পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া।  

খ. সিনিয়র শিক্ষক: দুটি প্রক্রিয়ায় শিক্ষক পদ থেকে সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি হতে পারে। অ. শিক্ষক পদে প্রশিক্ষণসহ সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সাপেক্ষে কমিশন কর্তৃক অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে শিক্ষক পদ থেকে সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন। আ. কমিশন কর্তৃক অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সনদ না থাকলে প্রথম টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির শর্ত সাপেক্ষে প্রথম টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষক পদ থেকে সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন। 

গ. বিশেষজ্ঞ শিক্ষক: দুটি প্রক্রিয়ায় সিনিয়র শিক্ষক থেকে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে পদোন্নতি হতে পারে। অ. সিনিয়র শিক্ষক পদে সর্বনিম্ন চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সাপেক্ষে কমিশন কর্তৃক অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সিনিয়র শিক্ষক থেকে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন। আ. বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য কমিশন কর্তৃক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সনদ না থাকলে দ্বিতীয় টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির শর্ত সাপেক্ষে দ্বিতীয় টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র শিক্ষক পদ থেকে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন ।  

উল্লেখ্য, বিশেষজ্ঞ শিক্ষক বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উপজেলা পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক মাস্টার ট্রেইনার হওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন। 

ঘ. সিনিয়র বিশেষজ্ঞ শিক্ষক: বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে সর্বনিম্ন তিন বছরের অভিজ্ঞতা সাপেক্ষে কমিশন কর্তৃক অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক থেকে সিনিয়র বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদে পদোন্নতি হতে পারে।

উল্লেখ্য, সিনিয়র বিশেষজ্ঞ শিক্ষক বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উপজেলা পর্যায়ের সকল ধরনের প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক হওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারে।

প্রশাসনিক পদমর্যাদা কাঠামো: ক. সহকারী প্রধান শিক্ষক: স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের বিশেষ নির্দেশকসমূহ (একাডেমিক ফলাফল, প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষার ফলাফল, চাকুরীকাল, বিশেষ অবদান ইত্যাদি) ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে, যেসকল বিদ্যালয়ে দশ বা ততোধিক পদ অথবা ২৫০ বা ততোধিক শিক্ষার্থী আছে সেসব বিদ্যালয়ের জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক পদসৃষ্টি করা যেতে পারে। 

বি. দ্র. সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি জরুরি নয়। তবে রাষ্ট্র চাইলে অন্যান্য বিষয় ঠিক রেখে এ পদ সৃষ্টি করতে পারে।

খ. প্রধান শিক্ষক: স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিনিয়র বিশেষজ্ঞ শিক্ষক অথবা সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে সর্বনিম্ন দুই বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের বিশেষ নির্দেশকসমূহ (একাডেমিক ফলাফল, প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষার ফলাফল, চাকুরীকাল, বিশেষ অবদান ইত্যাদি) ম্যাপিংইয়ের মাধ্যমে জাতীয় মেধা তালিকার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে।

তবে শর্ত থাকে যে যদি বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে একাডেমিক পদমর্যাদা লাভ এবং বিশেষ নির্দেশকসমূহ ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে প্রশাসনিক নিয়োগ প্রদান করা হয় তবে- এক. শিক্ষক পদমর্যাদা থেকে ধাপে ধাপে সিনিয়র শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও সিনিয়র বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পদমর্যাদা লাভ করায় প্রতি ধাপের জন্য আলাদা উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ করতে হবে। দুই. নির্দেশকসমূহ ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে প্রতি ধাপের বিপরীতে চলমান ব্যক্তিগত বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্ত বেতনের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্মানি ভাতা বরাদ্ধ রেখে বেতন নির্ধারণ করা যেতে পারে।   

সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা: একটি বিল্ডিং মজবুত ও টেকসই করতে হলে তার ফাউন্ডেশন যেমন মজবুত ও টেকসই করতে হয় এবং ফাউন্ডেশন মজবুত ও টেকসই করার জন্য তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ করতে হয় যা সহসাই দৃশ্যমান নয়। ঠিক একইভাবে একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানোন্নয়ন পূর্বক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তাই উন্নত বিশ্বে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পিরামিট থিওরিতে প্রাথমিকে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রাথমিকে প্রচলিত কাঠামোর সংস্কার এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগ করা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি।  

এক. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিজীবীর প্রায় এক-তৃতীনয়াংশ প্রাথমিকে নিয়োজিত। এই বড় সংখ্যক পরিবারের নিয়োগ ব্যবস্থাপানা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যাবলি সঠিকভাবে আঞ্জাম দেওয়ার জন্য স্বতন্ত্র ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কমিশন’ প্রয়োজন যাতে স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবীরা এই সেক্টরে আসার সুযোগ পায় এবং প্রক্তৃ মেধার যথাযথ মূল্যায়নসহ সকল কার্যাবলি সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।/

দুই. উপজেলা ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল, নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার এবং সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিশ্চিতকরণের বিধান রেখে বিধিমালা প্রণয়ন করলে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি প্রকৃত মেধাবীদের এই সেক্টরে আসার পথ সুগম হবে। মেধাবীরা এই সেক্টরে আসলে এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারলে তারা এই সেক্টর ছেড়ে চলে যাবে না এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে আশা করা যায় ।  

তিন. একাডেমিক পদমর্যাদা এবং প্রশাসনিক পদমর্যাদা বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হলে প্রতিষ্ঠান পাবে তুলনামূলক সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও প্রশিক্ষিত দায়িত্বশীল শিক্ষক ও প্রশাসক যার নেতৃত্বে প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম এবং কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন ও রক্ষায় সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে বলে ধারনা করা যায়। 

চার. একাডেমিক পদমর্যাদা ও প্রশাসনিক পদমর্যাদা বিশেষ প্রক্রিয়ায় লাভ করলে এবং বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির ব্যবস্থা থাকলে সকল শিক্ষক তার পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সবসময় ব্রত থাকবে বলে আশা করা যায়। শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং শিক্ষার্থীরা উপকৃত হলেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। 

পাঁচ. একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানসম্মত মানবসম্পদের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন মেধাবী শিক্ষক। মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করণের লক্ষ্যে মেধাবীদের যথাযথ সম্মান, মূল্যায়ন ও মর্যাদা দানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করি।  

ছয়. করোনাকালীন বাস্তবতা পরবর্তী কয়েকটি নিয়োগের পরিসংখ্যান দ্বারা বুঝা যায়, মেধাবীরা এই সেক্টরে আসতেছে, দেখতেছে এবং ভালো অপশনের ক্ষেত্র তৈরি করে চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষক সংকট চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই যে রাষ্ট্র মেধাবীদের ধরে রাখতে পারছে না এ দায় কার?  বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ পরিণতির জন্য রাষ্ট্র কি দায় এড়াতে পারে? ২০১৯ সালে নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়নের পূর্বে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিধিমালার মারপ্যাচে তুলনামূলক কম মেধাবী ও কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার দায়ও রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। ধারাবাহিক চলমান পুরোনো সংস্কৃতির শিকল ভাঙ্গতে না পারলে শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন অসম্ভব। এই আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে প্রাথমিক অবস্থায় শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রকে মোটাদাগে বিনিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্রের কী সেই সক্ষমতা আছে? যেহেতু প্রতিটি বিদ্যালয় এখন অবকাঠামোগতভাবে স্ব্যংসম্পূর্ণ তাই এতোদিন অবকাঠামো খাতে যে ব্যয় হয়েছে তা আর হবে না; পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হলে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত আলাদা বাজেটের প্রয়োজন হবে না। রাষ্ট্র চাইলে গতানুগতিক ধারার শিকল ও শৃঙ্খল ভেঙে নতুন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা সমোন্নত করতে পারে। দেশ ও জাতির প্রত্যাশা হলো, রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাবি এবং সহকারী শিক্ষক, নাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালিহাতী, টাঙ্গাইল।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন