অলোক আচার্য, ছবি: সংগৃহীত
কিয়ার স্টারমার গত দশ বছরের তুলনায় তার উত্তরসূরীদের থেকে বেশি সময়ই থেকে গেলেন যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায়। গত এক দশকে স্টারমারের উত্তরসূরীদের শুধু আসা যাওয়ার মধ্যেই দেখতে হয়েছে। এটাকে সহজ ভাষায় দেশটির অস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটও বলা যায়। এর পিছনের কারণ প্রকৃতপক্ষে কি সেটা দেশটির রাজনীতিবিদরাও খুঁজছেন। তবে অবশ্যই অর্থনীতি একটি ভাইটাল পয়েন্ট হিসেবে সামনে রয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি যতোই দেওয়া হোক সেসব পূরণ করা বেশ কষ্টসাধ্য হবে নেতাদের জন্য।
দেশটির অর্থনীতি যে গত এক দশক থেকে বেশ নাজুক এবং চাপে রয়েছে যার মূল ভুক্তভোগী হচ্ছেন দেশটির সাধারণ জনগণ সেটাই সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে মানুষের গড় সাপ্তাহিক আয় এক শতাংশেরও কম বেড়েছে, যা ২০১৯ সালের পর থেকে হওয়া প্রবৃদ্ধির তুলনায় সামান্যতম উন্নয়নও নয়। একই সঙ্গে করের বোঝাও গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুর্বল অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের কারণেই জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কিয়ার স্টারমার এবং তার আগের চার নেতাই যুক্তরাজ্যের নিম্ন প্রবৃদ্ধিকে প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের অধরাই রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে তেরেসা মে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল বছরে গড়ে মাত্র এক শতাংশ। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিমাপের অন্যতম সূচক মাথাপিছু জিডিপিও ছিল একই রকম হতাশাজনক। যুক্তরাজ্যের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতির এই পালাবদল সত্যি অবাক করে দেয়। দেশটির অর্থনীতির চাপ এবং জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এই দুইয়ের যোগানেই সরকারের উপর থেকে আস্থা অনেকখানি কমিয়ে দেয়। নতুন সরকার যিনি আসতে চলেছেন তার উপরেই বা জনগণের কতক্ষণ আস্থা থাকবে! অর্থনীতির চাপ প্রশমন করার কোনো জাদুও কোনো নেতার হাতে নেই। জনগণ যখন কনজারভেটিভ থেকে লেবার পার্টিতে ঝুঁকতে শুরু করেছিল তখনই বোঝা উচিত ছিল যে তাদের আসলে কি করা উচিত। যেকোনো উপায়েই জনগণের উপর থেকে আর্থিক চাপ কমানো উচিত। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং উল্টোটাই হয়েছে। একটি দলের পরাজয় সেদিন থেকেই শুরু হয় যখন জনগণ সেই দলটিকে আর উপযুক্ত মনে করে না। সেই কবে ব্রেক্সিট হয়েছে, অথচ এখনও যেনো তার রেশ কাটছে না। তারপর থেকেই যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি এবং রাজনীতির সময়টা ভালো যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব তো রয়েছেই, দলের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বও রয়েছে। এর মধ্যেই বিশ্বে নানা উত্থান-পতনের ভিতর দিয়ে গেছে। তার ধাক্কাও লেগেছে যুক্তরাজ্যেও। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, বাজারে বেকারত্ব বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম নাগাল ছাড়িয়েছে। অতএব জনগণ হতাশ হয়েছে নেতৃত্বের প্রতি। সেই হতাশা থেকেই যেভাবে জনপ্রিয়তা বাড়ে কোনো নেতার সেভাবেই বা তার থেকেও দ্রুত গতিতে জনপ্রিয়তা কমতেও দেখা যায়। সমস্যাটি শুরু হয় ব্রেক্সিটের পর থেকেই। জোট থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই যেনো শনির দশা পিছু ছাড়ছে না দেশটির রাজনীতিবিদদের। অর্থনৈতিক সংকটও তখন থেকেই দীর্ঘায়িত হতে শুরু করে। দেশটির জনগণ চাইছিল না যুক্তরাজ্য ব্রেক্সিটের পক্ষে থাকুক। কিন্তু ক্যামেরুন চাইছিলেন। শুরু হয় টানাপোড়ন। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে দেশটিতে ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর পালাবদল ঘটেছে। যেকোনো দেশের জন্যই এই ঘটনা শুভ ঘটনা নয়। ২০১৬ সালে ডেভিড ক্ষমতায় এসেছেন থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং কিয়ার স্টারমার। বরিস জনসন দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করেন। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি কার্যালয়ে লকডাউন ভঙ্গ করে পার্টি আয়োজনের অভিযোগ, যা ‘পার্টিগেট’ নামে পরিচিত, এবং একের পর এক মন্ত্রী ও সহযোগীর পদত্যাগ শুরু হলে নিজের দলের মধ্যেই তিনি চাপে পরেন। মূলত পার্টিগেট কেলেঙ্কারিই বরিস জনসনের কাল হয়।
জনসনের পর ক্ষমতায় আসেন লিজ ট্রাস। খুব অল্পদিনের মধ্যেই সরে দাঁড়াতে হয় লিজ ট্রাসকে এবং দায়িত্বে আসেন ভারতীয় বংশদ্ভূত ঋষি সুনাক। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন এবং দায়িত্ব ছাড়েন। কনজারভেটিভ দলের হাত থেকে ক্ষমতা যায় লেবার পার্টির হাতে। তখন দলটির ব্যাপক জনসমর্থন ছিল। এভাবে দেশটিতে ক্ষমতার হাতবদল চলছেই। এখানে যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে কোনো নেতার উপরেই জনগণ দীর্ঘ প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারছে না। তবে কি প্রধান দুই দল লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি উভয় রাজনীতিতে জনগণ থেকে সরে যাচ্ছে? প্রশ্ন উঠতেই পারে। আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে, নিজের দলের আস্থা অর্জনই শেষ পর্যন্ত কঠিন হয়ে উঠছে। এই অবস্থা কাটাতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়। সেই সময় কেউ পাচ্ছেন না এবং তার আগেই পদত্যাগ করতে হচ্ছে।
বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রায় দেড় দশক পর নির্বাচনে জিতে ইংল্যান্ডে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। তার আগে কনজারভেটিভ দলের স্থানে জনপ্রত্যাশায় উঠে আসে দলটি। তবে খুব সস্তিতে ছিলেন না স্টারমার। দলটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সমালোচিত হয়েছে। চার নির্বাচনে হার মানার পর কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসেছে কিয়ার স্টারমার। চার বছর আগে কট্টর বামপন্থী রাজনীতিবিদ জেরেমি করবিনের জায়গায় লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসেন স্যার কিয়ার স্টারমার। নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি চেয়েছিলেন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গণের অস্থিরতা দূর করতে। সেটি হয়নি। পরিস্থিতি যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত নামও শোনা যাচ্ছে। সেই নামটি বার্নহ্যাম। বার্নহ্যাম এখন পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দেশের মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের মতো তিনিও সীমিত সুযোগের মুখোমুখি হতে পারেন। একদিকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে অনাগ্রহী বন্ড বাজারের বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট ভোটাররা উভয় দিক থেকেই চাপ থাকবে। বর্তমানে উচ্চ ঋণ, সুদ পরিশোধের ব্যয়, দীর্ঘদিনের ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় কমানোর চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কারণে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের ঋণ গ্রহণের খরচ সবচেয়ে বেশি। লেবার পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর হচ্ছে দলটি তাদের নতুন নেতা পাচ্ছেন যার জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিরোধী শিবিরের থেকে আপাতত রক্ষা। তবে স্টারমারের মতোই বার্নহ্যামও নানা সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
১৪ বছরের কনজারভেটিভ দলের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে নিজেরাও ভালো নেই খুব একটা। জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার চাপ তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটির জনসমর্থন কমতে থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, জনকল্যাণ খাতে কাটছাঁট, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, ফিলিস্থিন ইস্যুতে সমালোচনা, ইউক্রেনকে দৃঢ় সমর্থন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে স্টারমারের জনপ্রিয়তায় ধস নামে। জরিপে স্টারমারের জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে আসায় এর পরিণতি কিছুটা অনুমান করা গিয়েছিল। হয়তো তিনিও তার উত্তরসূরিদের মতোই পরিণতি বরণ করতে পারেন। ব্রিটিশ করদাতা সংগঠন ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনে একটি নতুন কর আরোপ বা পুরোনো কর বাড়িয়েছে স্টারমারের সরকার। অথচ জনগণ তারও কয়েক বছর আগে থেকেই মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছিলেন। এই নতুন করারোপ তাকে জনসন্তুষ্টি থেকে জন সমর্থন হারানোর দিকে নিয়ে যায়। যদিও এসবই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবে ভেবেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এই অবস্থা থেকেই স্টারমারকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে দেশটির রাজনীতিতে আপাতত সংকট মিটলেও স্থায়ীভাবে সমাধান হতে আরও সময় প্রয়োজন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

