সৈয়দ মুহাম্মদ আজম, ছবি: সংগৃহীত
উন্নয়ন; খুব পরিচিত একটি শব্দ। একসময় উন্নয়নের সংজ্ঞা ছিল সহজ। বড় সড়ক, উঁচু সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, মাথাপিছু আয়, জিডিপির ঊর্ধ্বগতিÑ এসবই উন্নয়ন ভাবা হতো। মনে করা হতো, অর্থনীতি বড় হলে সমাজও এগিয়ে যাবে। কিন্তু আজ সেই ধারণা বদলে গেছে। প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়ন কাদের জন্য? কে এর সুফল পাচ্ছে? আর ভবিষ্যতের উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করবে কে বা কারা?
বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ের প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে অর্থনীতি। জলবায়ু পরিবর্তন পাল্টে দিচ্ছে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। কৃত্রিক বুদ্ধিমত্তা (এআই) বদলে দিচ্ছে শ্রমবাজার। জনসংখ্যার পরিবর্তন নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে উন্নয়ন আর শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি এখন নিরাপত্তা, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং মানবাধিকারেরও প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণাও একই বার্তা দিচ্ছে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন নির্ধারণ করবে শুধু সরকার নয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও একা নয়। বরং রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত সিদ্ধান্তই আগামী পৃথিবীর রূপরেখা গড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন বলছে, একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হবে ‘মানুষ’। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা বৈষম্য কমায়। সুযোগ বাড়ায়। মর্যাদা নিশ্চিত করে। মানুষকে সক্ষম করে তোলে।
অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) একই সুরে বলছে, শুধু কত উৎপাদন হলো, সেটি নয়। মানুষ কতটা ভালো আছে, সেটিই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক আস্থা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী অসমতা বেড়েছে। প্রযুক্তি সম্পদ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সম্পদ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশ্বের অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানি আজ এমন ক্ষমতার মালিক, যা অনেক রাষ্ট্রের অর্থনীতির সমান। ফলে উন্নয়নের সিদ্ধান্তেও তাদের প্রভাব বাড়ছে।
চ্যাথাম হাউস সতর্ক করেছে, ডিজিটাল যুগে উন্নয়নের প্রশ্ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তথ্যের মালিকানা, ডেটার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহারও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। এখানেই আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গ। আজ এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি অর্থনীতি পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করছে। কৃষিকে স্মার্ট করছে। আবার চাকরিও কমিয়ে দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, এআইয়ের নিয়ম কে বানাবে? কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানি? নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান?
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস মনে করে, প্রযুক্তির ভবিষ্যত নির্ধারণে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করবে। কারণ প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নয়। এর নকশার মধ্যেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করে।
জলবায়ু পরিবর্তন আরও বড় বাস্তবতা। একটি দেশ যত উন্নতই হোক, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে উপকূল রক্ষা করা কঠিন। খরা কিংবা বন্যা সীমান্ত মানে না। তাই উন্নয়নের ভবিষ্যত আজ বৈশ্বিক সহযোগিতার সঙ্গেও জড়িত।
স্টকহোম এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউট বলছে, জলবায়ু অভিযোজনকে উন্নয়নের মূল কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত করে সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। অবকাঠামো বেড়েছে। দারিদ্র্য কমেছে। বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সংযোগ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ কি প্রস্তুত? শিক্ষা কি প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে? শহর কি জলবায়ু সহনশীল হচ্ছে? নীতিনির্ধারণে তরুণদের কণ্ঠ কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী উন্নয়নের মান নির্ধারণ করবে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে দক্ষতা। যে দেশ দ্রুত নতুন দক্ষতা গড়ে তুলবে, সেই দেশই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। শুধু ডিগ্রি নয়। সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ডিজিটাল জ্ঞান এবং অভিযোজনের সক্ষমতা হবে নতুন মূলধন।
অন্যদিকে র্যান্ড করপোরেশন মনে করে, ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণ হবে তথ্যনির্ভর। বড় ডেটা, পূর্বাভাস বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। তবে একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অ্যালগরিদমের ভুলও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় অংশগ্রহণ।
আগে উন্নয়নের পরিকল্পনা রাজধানীতে বসে তৈরি হতো। এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। গ্রামের মানুষ তার নদীকে সবচেয়ে ভালো চেনে। উপকূলের মানুষ তার জোয়ারকে বোঝে। পাহাড়ের মানুষ তার বনকে জানে। তাই উন্নয়নের নকশায় তাদের কণ্ঠ থাকতে হবে।
নারীর অংশগ্রহণও সমান জরুরি। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট বলছে, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু সামাজিক ন্যায়বিচার নয়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও অন্যতম চালিকাশক্তি। যে সমাজ নারীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, সেই সমাজ দ্রুত এগিয়ে যায়।
তরুণরাও এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। আজকের তরুণেরা শুধু কর্মসংস্থান চায় না। তারা অংশগ্রহণ চায়। তারা স্বচ্ছতা চায়। তারা পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন চায়। তারা এমন রাষ্ট্র চায়, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে না, বরং প্রসারিত করবে। এই প্রজন্মের কণ্ঠ উপেক্ষা করলে উন্নয়নের ভবিষ্যতও দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়নের আরেকটি নতুন মাত্রা হলো আস্থা।
এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটার বারবার দেখিয়েছে, সরকার, ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে উন্নয়নের গতি মন্থর হয়। বিনিয়োগ কমে। সামাজিক বিভাজন বাড়ে। তাই উন্নয়নের ভিত্তি শুধু অর্থ নয়। বিশ্বাসও একটি বড় সম্পদ।
বিশ্বের সামনে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়ন কি কেবল কয়েকজন বিশেষজ্ঞের হাতে থাকবে? নাকি সাধারণ মানুষও তার ভবিষ্যত নির্ধারণে অংশ নেবে? উত্তরটি স্পষ্ট। ভবিষ্যতের উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক। হবে প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু মানবিক। হবে পরিবেশসচেতন, কিন্তু প্রবৃদ্ধিবিরোধী নয়। হবে উদ্ভাবনমুখী, কিন্তু বৈষম্যবর্ধক নয়। উন্নয়নের নতুন মানচিত্র কেবল অর্থনীতিবিদরা আঁকবেন না। সেখানে প্রকৌশলী থাকবেন। শিক্ষক থাকবেন। কৃষক থাকবেন। বিজ্ঞানী থাকবেন। উদ্যোক্তা থাকবেন। সাংবাদিক থাকবেন। তরুণ থাকবেন। আর থাকবেন সাধারণ নাগরিক।
কারণ উন্নয়ন কোনো ভবন নয়। উন্নয়ন একটি যাত্রা। কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা নয়। এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক চুক্তি। আজকের পৃথিবীতে উন্নয়নের ভবিষ্যত আর একক ক্ষমতার হাতে নেই। এটি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের হাতে। প্রযুক্তির হাতে। জ্ঞানের হাতে। সহযোগিতার হাতে। যে রাষ্ট্র এই পরিবর্তন বুঝবে, সে এগিয়ে যাবে।
যে রাষ্ট্র কেবল অতীতের উন্নয়ন মডেল আঁকড়ে থাকবে, সে পিছিয়ে পড়বে। অবশেষে মনে রাখতে হবে, উন্নয়নের সবচেয়ে বড় স্থপতি কোনো ভবন নির্মাতা নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত, নিরাপদ এবং সম্ভাবনাময় সমাজ গড়ে যেতে চান। উন্নয়নের ভবিষ্যত শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই নিরাপদ, যারা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানবিকতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে জানে।
লেখক: শিক্ষার্থী, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

