অলোক আচার্য, সংগৃহীত
শেষ হলো বিশ্বকাপ আয়োজন। শেষ হওয়ার পরেও যেন তার রেশ যায়নি। সমর্থকদের তর্কাতর্কিতে এখনও বিশ্বকাপ। কখনো সেই তর্ক পৌঁছে যাচ্ছে হাতাহাতিতে। সেই সঙ্গে শেষ হলো বাংলাদেশে কিছু অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু, কিছু সহিংসতা কিছু কান্না। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, বিশ্বকাপ শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ সংক্রান্ত ঘটনায় ২৩ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। কোথাও এই সংখ্যা ১২ বলা হয়েছে। এমনকি ফাইনাল শেষেও দু’জন মারা গেছেন। যেসব দেশ বিশ্বকাপ খেলতে গেছে সেসব দেশের পরাজয়ে কতজন মারা গেছেন বা কত স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে তা বলতে পারবো না।
তবে জাতি হিসেবে আমাদের আবেগ একটু বেশিই এটা সত্য। প্রিয় দলের পরাজয় সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এসব অন্ধ সমর্থক। বাঙালির আবেগ এতটাই বেশি যে নিজের জীবনও তুচ্ছ করে ভিন দেশের কোনো ফুটবল দলকে সমর্থন জানাতে হয়! এ যেন বিবেক আর আবেগের লড়াইয়ে আবেগের জয়!
বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশ নেই। তবে বাংলাদেশে উত্তেজনা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই উত্তেজনা নিজ দেশের জন্য নয় বরং আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের জন্য! ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা, ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই অতিরঞ্জিত কথা!
ফুটবল নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবেগের অন্ত নেই। নিজের দলের সমর্থকদের জন্য ডাক্তার ফ্রি রোগী দেখার ঘোষণা দেন, তো উকিল সাহেব ফ্রিতে মামলা লড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। সমর্থকরা মারামারিতে জড়িয়ে যান। পতাকা বাঁধতে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যায় কারও। সেই আবেগ সম্ভবত বাঙালি মুলুকেই বেশি। এমন সব ঘটনা ঘটে যে হাসি থেকে তা রীতিমতো কান্নার কারণ হয়। সেই আবেগের বাড়াবাড়ি মাত্রাতিরিক্ত। প্রিয় দলের বিশেষত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের খেলা হলে পিকনিকের আমেজ তৈরি হয়। আবার কখনো উভয় পক্ষের সমর্থকরা মুখোমুখি অবস্থানেও থাকেন। আবার কেউ কারও মুখ দর্শনও করেন না! অবশ্য খেলা শেষ হলেই এই উন্মাদনার শেষ হয়!
এই উন্মাদনা আমাদের এ উপমহাদেশে তৈরি হয়েছে মূলত দুই কিংবদন্তীর খেলাকে কেন্দ্র করে। আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ব্রাজিলের পেলে যিনি কালো মানিক নামে পরিচিত। এই দুই খেলোয়াড় ফুটবলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কে শতাব্দির সেরা খেলোয়াড় তা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। ম্যারাডোনার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে করা সেই নান্দনিক গোল সমর্থকদের কাছে আজও স্মরণীয়। আবার পেলের খেলাও দুর্দান্ত। আবার হালের মেসি বা নেইমার বিতর্কও একভাবে চলছে। তা চলুক। তবে এসব বিতর্ক যেন খেলার মাঝেই সিমাবদ্ধ থাকে, ব্যক্তিগত আক্রমণে না যায়। আমাদের বোঝা উচিত এটা বিনোদনের জন্য, কাউকে আঘাত করার জন্য না।
ফেসবুকে তো রীতিমতো একদলের সমর্থক অন্যদলের সমর্থকদের নিয়ে নানা ধরনের স্ট্যাটাস দেয়। আমাদের সেই বাড়াবাড়িতে মারামারি পর্যন্ত ঘটে। এমনটা কাম্য নয়। অল্প কয়েকদিনের আবেগ দিয়ে কারও ক্ষতি যেন না হয়। এশিয়ার বাইরের দেশে এমন সমর্থন হয় কি না জানা নেই। বিশ্বজুড়ে উন্মাদনার নাম ফুটবল। গ্রামেগঞ্জে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল। রীতিমতো পতাকা টাঙানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কোন দলের সমর্থকরা কত বড় পতাকা বানাবে সেই প্রতিযোগিতা চলে। জমি বিক্রি করেও বিশালাকার পতাকা তৈরি হয়েছে! এসব বাড়াবাড়ি একটু আশ্চর্যই বটে!
এই বিশ্বকাপ ঘিরেই পৃথিবীর অর্থনীতিতেও নেমে আসে দুর্যোগ। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি। পৃথিবী জুড়েই মানুষ কাজ রেখে খেলা দেখে। ঠিক এই কর্মঘণ্টাগুলো হিসাব করলেই বিশাল অঙ্ক পাওয়া যায়। আরও কিছু হিসাব রয়েছে। টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপের কারণে ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। মানবসম্পদ ও কর্মী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ইউকেজির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার জন্য কর্মীদের অনুপস্থিতি, অফিসে দেরিতে আসা এবং কাজে মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৭ বিলিয়ন বা এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে। দেশটিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১১ দশমিক সাত বিলিয়ন বা এক হাজার ১৭০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার সমান। ইউকেজির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কর্মী ছুটি নিয়েছেন, কেউ অফিসে দেরিতে পৌঁছেছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেছেন। কর্মক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা প্ল্যাট ফর্ম এনভয়-এর তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র দল ৬ জুলাই শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ৭ জুলাই মঙ্গলবার দেশটির অফিসগুলোতে কর্মীদের উপস্থিতি হঠাৎ ২৬ শতাংশ কমে যায়। এই অনুপস্থিতির হার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজন সুপার বোল ফাইনালের পরদিনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। শুধু অফিসে কর্মীদের উপস্থিতিই কমেনি, বরং ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। ওই দিন ক্লায়েন্ট মিটিং, চাকরির সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক বৈঠকের সংখ্যা প্রায় ৩২ শতাংশ কমে যায়। তবু তো বিশ্বকাপ বন্ধ থাকবে না। এটা আনন্দের উৎস।
আবেগ থাকা ভালো কিন্তু আবেগে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। আগামী চার বছরের জন্য এই আবেগ কমে যাবে। তবে মাঝে রেখে যাবে কিছু স্মৃতি যা দুঃসহ বেদনায় পোড়াবে কাউকে। একটি খেলাকে কেন্দ্র করে একজনও মারা যাবে এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিয়ে বাড়ির প্যান্ডেল সাজছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায়। বহু টাকা খরচ করে ভিন দেশের পতাকা তৈরি করেছে কেউ। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি এদের অনেকেই দেশের পতাকাটা কোনোদিন আবেগ নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেনি। অনেকেই জাতীয় পতাকার সঠিক ব্যবহারও জানে না। পতাকা নিয়ে সেভাবে আগ্রহও নেই। এই পতাকা পাওয়ার জন্যই কিন্তু একদিন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল। বিদেশের পতাকা নিয়ে ঝাপাঝাপির জন্য না! নিজের পতাকাট একদিন বুকের মাঝে নিয়ে দেখবেন এর চেয়ে অনেক বেশি শান্তি লাগছে। জার্সিপাড়া এখন ব্যাপক ব্যস্ত। পৃথিবীতে যত ধরনের খেলাধুলা রয়েছে তার মধ্যে ফুটবলই একমাত্র খেলা যা অধিকাংশ দেশেই জনপ্রিয় খেলার তালিকায়। মূলত অল্প সময়, খেলার ধরন, গ্রহণযোগ্যতা, নান্দনিকতা, খেলার গতি প্রভৃতি কারণে ফুটবলের সমান জনপ্রিয় খেলা নেই। যদিও এ উপমহাদেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা গত কয়েক দশক ধরে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কয়েকটি দেশের মধ্যেই তা সিমাবদ্ধ। কিন্তু ফুটবল আছে প্রতিটি দেশে।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ সব পার করে এই খেলা সবার মাঝে সমান উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফুটবলই একমাত্র খেলা যা প্রায় প্রতিটি দেশেই খেলা হয়। বাংলাদেশের ফুটবলেও একসময় রমরমা অবস্থা ছিল। এখানেও আবাহনী এবং মোহামেডানের সমর্থকরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এই দুই দলের খেলা থাকলে সেদিন বিশ্বকাপের আমেজ কিছুটা হলেও পাওয়া যেত। যদিও দেশের ফুটবলের সেই দিন এখন আর নেই। যাই হোক, এখন বাড়িতে বাড়িতে উড়তে দেখা যাবে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা। অন্যদেশের পতাকাও থাকে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশেরও পতাকা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয় মূলত আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে। মাঝে মধ্যেই এই দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। পত্রিকা, টেলিভিশনের শিরোনাম হয়। যদিও এসব হয় আবেগ থেকে কিন্তু অতি আবেগে ভাসা কোনো ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ফুটবল নিয়ে আবেগ ভালো, তবে আবেগের আতিশয্য ভালো না। সেসব দেখে চলাই উত্তম।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

