Logo

মতামত

জাতীয়ভাবে শাহ আবদুল করিমকে স্মরণ না করার বেদনা

Icon

সৈয়দা আঁখি হক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৩৪

অ
জাতীয়ভাবে শাহ আবদুল করিমকে স্মরণ না করার বেদনা

গ্রাফিকস: বাংলাদেশের খবর

গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলার মাটি ও মানুষের গানের অন্যতম সাধক, গণমানুষের কবি, বাউলকবি শাহ আবদুল করিমের ১৭তম প্রয়াণ দিবস ছিল। ভাটিবাংলার জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, শোষণ-বঞ্চনা এবং আত্মিক অনুসন্ধানকে যিনি গানের ভাষায় ধারণ করেছিলেন, তাঁর স্মরণে দিনটি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। সেই দায়িত্বেরই অংশ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের স্মরণে অনুষ্ঠান আয়োজন করা। 

আমাদের প্রত্যাশা ছিল, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় তথা সাধক/মহাজনদের জন্ম-মৃত্যু বা বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে শিল্পকলা একাডেমি নিজস্ব ধারায় ‘স্মরণোৎসব’ পালন করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, এবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয়ভাবে শাহ আবদুল করিম স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি! 

ভাটিপুত্র শাহ আবদুল করিম আমাদের লোকজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার। তাঁর গান মানুষের কথা, বাস্তবতার কথা, সম্প্রীতি ও সাম্যের কথা বলে। তাঁর সৃষ্টিতে আছে মাটির গন্ধ, প্রেম, মানবতা, আত্মসমালোচনা, আত্মজিজ্ঞাসা, স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ। তাঁর গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় লোকসংস্কৃতি আমাদের বর্তমান পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া অমূল্য সম্পদ।

তাই প্রশ্ন জাগে, যে বাউলকবি গণমানুষের কথা বলেছেন, জীবনদর্শন ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলার বাউলগান ও লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁর প্রয়াণ দিবস কি আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়?

বাংলাদেশের সংস্কৃতি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়! এ দেশের সংস্কৃতির আসল সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়, জনপদ আর মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। কোথাও বাউল, কোথাও মরমি গান, কোথাও আবার ভাটিয়ালি, কোথাও বা জারি-সারি, ভাওয়াইয়া, কবিগান কিংবা পালাগান। এভাবেই নানা ধারার শিল্পচর্চায় সমৃদ্ধ বাংলার সংস্কৃতি।

এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অনেকেই আজ বিস্মৃতপ্রায়। কোনো কোনো অঞ্চলের কবি, গীতিকার, সুরকার, লোকশিল্পী, সাধক ও সাহিত্যিকের নাম হয়তো স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।

আমরা প্রায়ই বলি, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু সংরক্ষণ শুধু পুরোনো গান বা বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যাঁরা সেই গান সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁদের জীবনবোধ এবং অবদানও সংরক্ষণ করতে হবে।

জাতীয় প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি কেবল অনুষ্ঠান আয়োজনের স্থান নয়; এটি আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির স্মৃতি ধারণ, সংরক্ষণ ও চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে দেশবরেণ্য শিল্পী-সাহিত্যিক, সাধক-কবি ও লোকসংস্কৃতির ধারকদের স্মরণ করাও একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব বটে।

আজ যখন লোকগান নানা ধরনের বাণিজ্যিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন অনেক পুরোনো গান ও লোকধারা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে, তখন শাহ আবদুল করিমের মতো সাধকদের স্মরণ করা আরও বেশি প্রয়োজন মনে করছি। এঁদের গান কেবল মঞ্চ/টেলিভিশনে পরিবেশনের জন্য নয়; এঁদের জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা, গবেষণা প্রয়োজন।

একটি স্মরণানুষ্ঠান হয়তো শাহ আবদুল করিমের মতো বিশাল সৃষ্টিশীল মানুষকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সেই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম তাঁর গান সম্পর্কে জানতে পারবে, নানা উপাদানে সমৃদ্ধ তাঁর সৃষ্টিকে মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন গবেষকেরা, আর সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে আমাদের সংস্কৃতি ও শেকড়ের গন্ধ।

যে শেকড় আমাদের পরিচয় দিয়েছে, সেই শেকড়ের মানুষগুলোকে স্মরণ করা আমাদের দায়িত্ব। কারণ স্রষ্টারা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় একটি সময়, একটি জনপদ এবং আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১২ সেপ্টেম্বর চলে গেছে। জাতীয়ভাবে একটি স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হয়নি! কিন্তু এই বেদনা থেকেই আগামী দিনের জন্য নতুন প্রত্যাশা তৈরি হতেই পারে। আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বরেণ্য লোকসাধক/শিল্পী তথা সৃষ্টিশীল মহাজনদের রচনা ও জীবনদর্শনকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়েও নিয়মিত গবেষণা, আলোচনা, সংগীতানুষ্ঠান ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত থাকে। 

শাহ আবদুল করিমকে স্মরণ করা মানে ভাটিবাংলার মানুষ, মাটি, জীবন ও আমাদের লোকঐতিহ্যকেই সম্মান করা। সুতরাং, শাহ আবদুল করিমের মতো বেশ কয়েকজন মহাজনকে নিয়ে গ্রন্থপ্রণেতা ও বাংলার সংগীতানুরাগীদের এই প্রত্যাশা মহাজনদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আমাদের শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই।

লেখক: লোকসংস্কৃতি গবেষক

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন