অলোক আচার্য, সংগৃহীত
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ তোড়জোড় শুরু করেছে। এ কথা ঠিক যে বৈশ্বিক সুস্থতা বজায় রাখতে এই দীর্ঘ যুদ্ধ বন্ধ হওয়া আবশ্যক। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এই তোড়জোড়ের পিছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?
এর উত্তর হতে পারে— এক. সামনেই দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা নিম্নমুখী হওয়া ভাবমূর্তি তুলে ধরতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের গল্প সামনে আনা। দুই. ইউক্রেনকে সহায়তা করতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং হচ্ছে বা ভবিষ্যতেও করতে হবে তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা বোঝার মতো। আবার হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নেওয়া।
তবে যাই হোক যুদ্ধটা যেকোনো মূল্যেই বন্ধ হতেই হবে। অতএব আমরা চাই এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। এই যুদ্ধ এখন নতুন কৌশলে প্রবেশ করেছে। এটা নতুন নয়। যুদ্ধ যখন দীর্ঘায়িত হয় তখন দেশগুলো এই কৌশল অবলম্বন করে। এর কারণ সেনা সংকট এবং আরও সেনা সদস্যদের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া সম্মুখযুদ্ধে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বেশী প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞগণ এই যুদ্ধের কৌশলকে বলছেন সবচেয়ে জটিল। কারণ এখানে টার্গেট অর্থনীতি, টার্গেট শক্তিকেন্দ্র, সামরিক কারখানা ইত্যাদি। অর্থাৎ একটি দেশকে দুর্বল করতে যা যা প্রয়োজন সেই রণকৌশল গ্রহণ করা হয়। যা এখন দুই দেশই করছে। গণমাধ্যমগুলো বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এক নতুন ও জটিল ধাপে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের সীমান্তরেখা বা গ্রাম দখলের পুরোনো সমীকরণ ছাপিয়ে এখন মূল লড়াই দাঁড়িয়েছে জাতীয় সহনশীলতার ওপর; কোন পক্ষ প্রতিপক্ষের টিকিয়ে থাকার শক্তি ধ্বংস করতে পারবে?
কৌশলগত এই পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রবিন্দু শত কিলোমিটার দূরের শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক কারখানা ও অর্থনীতি কেন্দ্রগুলো। ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা রাশিয়ার থেকে কম এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধে সেই সক্ষমতা আরও কমেছে। ফলে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট দূরপাল্লার হামলার ওপর জোর দিচ্ছে। রাশিয়াও কিয়েভকে দুর্বল করতে চাইছে। মাঝে মধ্যেই ইউক্রেনের অভ্যন্তরে হামলা করে স্বাভাবিক জনজীবন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো অচল করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের গভীরে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে শহরগুলোকে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলার চেষ্টা করছে মস্কো। এতে করে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা কাজ করছে। এর ফলে দেশটিতে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। দেশটিতে জীবনযাত্রা ক্রমশই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এসব হামলার মধ্যেও উভয় দেশ আলোচনার টেবিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। মূলত যুদ্ধ তো এক সময় বন্ধ করতেই হবে। সুবিধা আদায়ের বা উদ্দেশ্য পূরণের ধাপটা হবে আলাদা। যত বেশি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে ততো বেশি ক্ষতি হবে উভয় দেশেরই। তবে আলোচনার ভিত্তি কি হবে সেখানেই প্রশ্ন রয়েছে। উভয় পক্ষ এই যুদ্ধ থেকে আসলে কি চায় সেটা স্পষ্ট নয়। রাশিয়ার উদ্দেশ্য যে কিছুটা সফল এবং বিপরীতে ইউক্রেন কোণঠাসা হলেও মাঝে মধ্যে রাশিয়ায় বেশ কৌশলগত আক্রমণ চালাচ্ছে সেটাও রাশিয়ার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। তাই পুতিনও যুদ্ধ শেষ চান হয়তো। তবে তার বিনিময় কি হবে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন- এমনটাই কথা ছিল নির্বাচনের আগে থেকেই।
তবে সেই পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না। একইসাথে রাশিয়াকে থামানো এবং ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষা করা যে কঠিন হবে সে তো জানা ছিল। সম্প্রতি একের পর এক ঘটনা বিষয়টি খোলোসা করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এই থিওরি মানে ইউক্রেনকে চাপে ফেলে বা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পরাজিত করে যুদ্ধ বন্ধ করতে জোর দেওয়ার বিষয়ে আন্দাজ করা যায়নি। ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধ কৌশল এখন পর্যন্ত খুব একটা কাজে দেয়নি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যদি বিরতিতে যাওয়াও সম্ভব হবে সেটিও জনগণের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিপরীতে একটি শক্ত মনোভাব গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কারণ জনমত ক্রমেই ট্রাম্পের বিপক্ষে যাচ্ছে। আর যুদ্ধ শুধু রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের হচ্ছে না, যুদ্ধ হচ্ছে ইরানের সাথেও। এখানেও চাপে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ সরাসরি নিজেই এই যুদ্ধে রয়েছে দেশটি। এরই মধ্যে বিপুল অর্থ ঢেলেছেন এই যুদ্ধের পিছনে।
স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ব বিশেষত ইউরোপের নেতারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন যে এরপর তারা কোন পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখবেন। যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে ইউক্রেনকে সমর্থন যোগানোর জন্য পর্যাপ্ত সামরিক সামর্থ ইউরোপের নেই। এই সত্যিটাও জানেন জেলেনস্কি এবং ইউরোপের নেতারাও। প্রথম থেকেই এই যুদ্ধ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি যুদ্ধ। কারণ অস্ত্র এবং অর্থ দুটোই সরবরাহ করতো যুক্তরাষ্ট্র এবং তা ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে বেশি। ট্রাম্প একটি নতুন যুক্তরাষ্ট্র গড়তে চাইছেন যেখানে কোনো দেশকে সাহায্য করার বিনিময়ে সরাসরি কোনো সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রকেও পেতে হবে। দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধে ইউক্রেন অনেকটাই বিপর্যস্থ, আশানুরুপ ফল পায়নি রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং কিছু অংশ ইতিমধ্যেই রাশিয়ার দখলে গেছে যা হয়তো আর ফেরত পাওয়া হবে না। সেসব এলাকা বাদ দিয়েই হয়তো যুদ্ধ বিরতির চুক্তিতে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে এই কয়েক বছরের যুদ্ধে ইউক্রেনের লাভ কি হলো? বরং রাশিয়া উদ্দেশ্যের অনেকটা পূরণ করতে সক্ষমত হয়েছে।
এরই মধ্যে রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি। গত ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন দিন দুমা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ করে রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ফলাফল অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে দেশটির মোট ভোটারের ৫৯ দশমিক ৩২ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। গণনা করা ভোটের মধ্যে ৫৮ শতাংশের বেশি পেয়েছে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি। ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন হিসেবে এই ফলাফলকে তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বার্তাও দিতে পারে রুশ সরকার। এই বিজয় পুতিনের ইউক্রেন অভিযান সহসাই বন্ধ হওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত থেকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। তবে সম্ভাব্য চুক্তির জোর সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা সাময়িক হলেও স্বস্তি।
সর্বোপরি যুদ্ধটা বন্ধ হওয়া দরকার। যেসব যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ রশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রথম দিকে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশেরই মত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বেশিরভাগই ভাবতে ব্যর্থ ছিলেন যে, রাশিয়া এই যুদ্ধ পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। যুদ্ধের হিসাব-নিকাশও ছিল অন্যরকম। সময়ের সাথে সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি এমনকি পুরো পৃথিবীর দৃশ্যপটে পরিবর্তন এসেছে। পুতিনের বিজয়ের ফলে এই যুদ্ধ আরও কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাকেই সামনে আনে। ফলে একটি স্থায়ী যুদ্ধ বিরতি চুক্তির থেকে আপাতত একটি কিছুটা দীর্ঘ মেয়াদে অস্থায়ী চুক্তি হওয়াই ভালো। ইউক্রেনের পুনর্গঠন প্রয়োজন এবং পুরো কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। অনেকেই এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা দেখেছিলেন সেটিও এখন আর নেই।
ইউরোপের দিকে রাশিয়ার যে হুমকি ছিল সেটিও পুতিন নেই বলে খোলসা করে দিয়েছেন। আর সেটি এই মুহূর্তে করবেন না। কারণ দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে রাশিয়াও অর্থনীতি এবং সামরিক দিক থেকে ক্রমশই দুর্বল হয়েছে। আর ইউরোপও এখন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। আমেরিকার নতুন পরিকল্পনায় ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে। ইউক্রেনকে প্রথম থেকেই যুদ্ধে সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের পাশে রয়েছে। রয়েছে ইউরোপের সহায়তাও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধটা থামবে কবে? একটি যুদ্ধবিরতি হবে কবে?
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

