প্রযুক্তির ভুলে কৃষকের কোটি টাকার ক্ষতি
মেহেরপুরের পেঁয়াজ বিপর্যয় আমাদের কী শিক্ষা দেয়
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১৯:৫৪
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্যই তৈরি হয়। কৃষিতেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন বাড়িয়েছে, শ্রম কমিয়েছে এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যখন পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া মাঠে প্রয়োগ করা হয়, তখন সেটি আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। মেহেরপুরের সাম্প্রতিক পেঁয়াজ সংরক্ষণ বিপর্যয় আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাই আবারও তুলে ধরেছে।
একজন কৃষক যখন জমিতে বীজ বপন করেন, তখন তিনি শুধু একটি ফসল ফলান না; তিনি নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎও গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। একটি মৌসুমের সফলতা তার সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং আগামী বছরের চাষাবাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই ফসল যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়, কৃষক তা মেনে নিতে পারেন। কিন্তু যখন সরকারি পরামর্শে ব্যবহৃত প্রযুক্তির কারণে সেই ফসল নষ্ট হয়, তখন ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হয় হতাশা, ক্ষোভ এবং অবিশ্বাস।
মেহেরপুরের পেঁয়াজচাষিরা সরকারি ভর্তুকিতে সরবরাহ করা ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ ব্যবহার করেছিলেন পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের আশায়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক মাস নিরাপদে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। অধিক লাভের আশায় অনেক কৃষক সেই পরামর্শ গ্রহণ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংরক্ষিত পেঁয়াজের বড় অংশ পচে গেছে, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দেশীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষিত পেঁয়াজের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে।
এর ফলে কৃষকের ক্ষতি শুধু পচা পেঁয়াজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক খরচ, সংরক্ষণ ব্যয় এবং বাজারমূল্যের পতন—সব মিলিয়ে লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে। যে কৃষক লাভের আশায় আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিলেন, তিনি আজ ঋণ ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যে প্রযুক্তি কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হলো, সেটি কি স্থানীয় পরিবেশ, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং সংরক্ষণ বাস্তবতার সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তাহলে এমন বিপর্যয় কেন ঘটল? আর যদি পরীক্ষা না করেই মাঠে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তাহলে এর দায় কে নেবে?
বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে এটি প্রথম ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে ত্রুটিপূর্ণ বীজ, অপরিকল্পিত প্রকল্প, বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা কিংবা ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রায় প্রতিবারই দেখা গেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করেছেন কৃষকই।
এই ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কৃষিতে কোনো নতুন প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে প্রয়োগের আগে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রদর্শনী ও বাস্তব পরীক্ষা অপরিহার্য। ল্যাবরেটরির সফলতা আর কৃষকের মাঠের সফলতা এক বিষয় নয়। একটি প্রযুক্তি কাগজে যতই কার্যকর মনে হোক, স্থানীয় বাস্তবতায় তার ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
এ কারণে কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থায় একটি নীতি আরও জোরালোভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন—“প্রদর্শনী আগে, সম্প্রসারণ পরে।” প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষা, তারপর কৃষকের কাছে বিস্তার। এতে যেমন প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা যায়, তেমনি কৃষকের সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকিও কমে আসে।
এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। যেসব কৃষক সরকারি পরামর্শ অনুসরণ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে ঋণ পুনর্গঠন এবং পরবর্তী মৌসুমে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে কোথায় ত্রুটি ছিল তা প্রকাশ করা দরকার। জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হয় না।
বাংলাদেশের কৃষি আজ নতুন সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রযুক্তির সফলতা তখনই অর্থবহ, যখন তা কৃষকের জীবনকে নিরাপদ করে, নতুন সংকটে ঠেলে দেয় না। কৃষি উন্নয়নের নামে এমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত নয়, যেখানে পরীক্ষার মাশুল দিতে হয় কৃষকের রক্ত-ঘামে ফলানো ফসল দিয়ে।
মেহেরপুরের পেঁয়াজ বিপর্যয় তাই শুধু কয়েকজন কৃষকের ক্ষতির গল্প নয়; এটি কৃষি নীতিনির্ধারণের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনার সঠিক মূল্যায়ন ও শিক্ষা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল আরও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কারণ প্রযুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য কৃষকের জীবন সহজ করা, তাকে নতুন দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেওয়া নয়। আর কৃষকের ক্ষতির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো কৃষি উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না।
লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা

