কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে মাঠপর্যায়ের যাচাই কেন জরুরি
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১৩:১১
ভোরের প্রথম আলো যখন শিশিরভেজা ধানের পাতায় ঝিলমিল করে ওঠে, তখন বাংলার কৃষক নতুন দিনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে নামেন। তাঁর ঘামে জন্ম নেয় দেশের খাদ্য, তাঁর শ্রমেই টিকে থাকে কোটি মানুষের জীবন। এই কৃষককে আরও দক্ষ, উৎপাদনশীল ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিই বাংলাদেশের কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার ফলে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন জাত, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং রোগবালাই-সহনশীল ফসল। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসব উদ্ভাবনের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে একটি মৌলিক সত্য আমাদের মনে রাখতে হবে—গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ আর কৃষকের মাঠের বাস্তবতা কখনোই এক নয়। গবেষণা খামারে কোনো প্রযুক্তি সফল হলেই তা দেশের সব অঞ্চলে একইভাবে সফল হবে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই নতুন কোনো প্রযুক্তি বা ফসলের জাত ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের আগে বাস্তব মাঠে তার কার্যকারিতা যাচাই করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কোথাও খরা, কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও আকস্মিক বন্যা, আবার কোথাও শৈত্যপ্রবাহ। একেক অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু এবং রোগবালাইয়ের ধরনও ভিন্ন। ফলে স্থানীয় পরিবেশে কোনো প্রযুক্তির অভিযোজন ক্ষমতা যাচাই না করেই সেটি কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হলে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
এমনিতেই কৃষক আজ নানা সংকটের মধ্যে রয়েছেন। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই অবস্থায় তিনি যখন নতুন কোনো প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, তখন তাঁর প্রত্যাশা থাকে উৎপাদন বাড়বে এবং লাভ নিশ্চিত হবে। কিন্তু পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি তিনি ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না; কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ ব্যবস্থার প্রতিও তাঁর আস্থা কমে যায়।
সম্প্রতি মেহেরপুরের পেঁয়াজ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে, তা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অধিক লাভের আশায় কৃষকেরা সরকারি ভর্তুকিতে পাওয়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু অনেক কৃষকের অভিযোগ, প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে তাঁদের সংরক্ষিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। এতে শুধু পেঁয়াজের ক্ষতিই হয়নি; বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক ব্যয়, সংরক্ষণ খরচ এবং বাজারমূল্যের ওঠানামা মিলিয়ে তাঁদের লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়—কৃষিতে কোনো প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের আগে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও প্রদর্শনী অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাগারে একটি প্রযুক্তি সফল হলেও বাস্তব মাঠে তার কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে। স্থানীয় জলবায়ু, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রযুক্তিটির সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করে তা কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
এ কারণেই কৃষিতে একটি নীতি আরও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা প্রয়োজন—আগে প্রদর্শনী, পরে সম্প্রসারণ। সীমিত পরিসরে মাঠে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করে প্রযুক্তির ফলাফল যাচাই করা হলে কৃষক নিজের চোখে এর কার্যকারিতা দেখতে পারেন। বাস্তব পরিবেশে ফলন, উৎপাদন ব্যয়, রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বাজার সম্ভাবনা সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এতে প্রযুক্তির প্রতি কৃষকের আস্থা যেমন বাড়ে, তেমনি গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার অন্যতম বড় সাফল্যই হলো এই মাঠভিত্তিক প্রদর্শনী কার্যক্রম। অতীতে উন্নত ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও সবজির বহু জাত এভাবেই কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। কৃষক যখন নিজের এলাকার অন্য কৃষকের জমিতে একটি প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ দেখেন, তখন সেটি গ্রহণে তিনি অনেক বেশি আগ্রহী হন। বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে কার্যকর প্রচারণা আর কিছু হতে পারে না।
মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের আরেকটি বড় সুবিধা হলো স্থানীয় সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা। কোনো রোগ, পোকামাকড় বা পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে গবেষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কাও অনেক কমে আসে।
কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি—কৃষক নতুন প্রযুক্তির বিরোধী নন। তিনি শুধু নিশ্চিত হতে চান, প্রযুক্তিটি তাঁর জমি, তাঁর পরিবেশ এবং তাঁর বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলবে। এই আস্থা তৈরি হয় মাঠভিত্তিক পরীক্ষা, প্রদর্শনী এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির অসীম সম্ভাবনা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে হলে গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কৃষকের জমি কোনো পরীক্ষাগার নয়। তাঁর প্রতিটি মৌসুম, প্রতিটি বীজ এবং প্রতিটি বিনিয়োগ তাঁর জীবিকা, পরিবার ও ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগে বাস্তব মাঠে তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে, ঝুঁকি কমিয়ে এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আমাদের একটি নীতিতেই অটল থাকতে হবে—আগে মাঠে যাচাই, পরে সম্প্রসারণ। এই পথই বাংলাদেশের কৃষিকে আরও টেকসই, আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী করে তুলবে।
লেখক: কৃষি উদ্যোক্তা, সংগঠক ও প্রশিক্ষক

