রমজান মাস আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমত, ক্ষমা ও মুক্তির মাস। । এ রাতকে আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো রাতের ভাগ্যে জোটেনি। কোরআন অবতরণের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই রাতেই সংঘটিত হয়েছে। শবে কদর এমন এক রাত, যা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। কোরআন ও হাদিসে এ রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
শবে কদরের অর্থ ও পরিচয়
‘কদর’ শব্দের অর্থ হলো মর্যাদা, সম্মান, ভাগ্য নির্ধারণ বা তাকদির। সেই হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ-মহাসম্মানিত রাত, ভাগ্য নির্ধারণের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাআলা মানুষের আগামী এক বছরের তাকদির নির্ধারণ করেন এবং তাঁর বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল করেন। এই রাত রমজান মাসের শেষ দশকের কোনো এক বেজোড় রাতে সংঘটিত হয় বলে হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কোরআনের আলোকে শবে কদরের গুরুত্ব
শবে কদরের গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ তাআলা সম্পূর্ণ একটি সুরা নাজিল করেছেন-সুরা কদর। আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ [সুরা কদর : ১-৩] এই আয়াতগুলোই শবে কদরের মর্যাদা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। হাজার মাস মানে প্রায় তিরাশি বছরেরও বেশি সময়। অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদতের সওয়াব তিরাশি বছরের ইবাদতের চেয়েও বেশি।
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ [জিবরাইল] তাদের রবের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে।’ [সুরা কদর : ৪] এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, শবে কদর হলো ফেরেশতাদের আগমন ও তাকদির নির্ধারণের রাত। আল্লাহর রহমত এ রাতে পৃথিবীতে বিশেষভাবে নাজিল হয়।
কোরআন নাজিলের রাত
শবে কদরের অন্যতম বড় মর্যাদা হলো-এই রাতেই কোরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘রমজান মাস-যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।’ [সুরা বাকারা : ১৮৫] অতএব, শবে কদর কোরআনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এ রাতে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
হাদিসের আলোকে শবে কদরের ফজিলত
রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুল সা. বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় শবে কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এ হাদিসে শবে কদরের সবচেয়ে বড় ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে-গুনাহ মাফ। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?
অন্য হাদিসে তিনি বলেন- ‘তোমরা শবে কদর অনুসন্ধান করো রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে।’ [সহিহ বুখারি] এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, শবে কদর নির্দিষ্ট কোনো এক রাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এর অনুসন্ধান করা সুন্নত।
শবে কদরে ফেরেশতাদের অবতরণ ও শান্তি
কোরআনে বলা হয়েছে- ‘সে রাতটি শান্তিময়-ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’ [সুরা কদর : ৫] এই শান্তি শুধু বাহ্যিক নয়; বরং এটি অন্তরের শান্তি। শবে কদরে শয়তানের প্রভাব কমে যায়, গুনাহের পথ সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর রহমত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
শবে কদরের আমল ও ইবাদত
শবে কদরে সর্বোত্তম আমল হলো-নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার। বিশেষ করে হাদিসে বর্ণিত দোয়াটি পড়া সুন্নত- ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ এ রাতে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির রাত
শবে কদর মানুষকে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির দিকে আহ্বান করে। জীবনের গুনাহ, অবহেলা ও ভুলের জন্য তওবা করার এ রাত এক সুবর্ণ সুযোগ। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না।
শবে কদর অবহেলার ক্ষতি
যে ব্যক্তি শবে কদরের মতো মহামূল্যবান রাত অবহেলা করে, সে অসংখ্য সওয়াব ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। হাদিসে এসেছে-এ রাত থেকে যে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃত অর্থেই বঞ্চিত।
মহিমান্বিত রাত
শবে কদর ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত রাত। কোরআন নাজিল, ফেরেশতাদের অবতরণ, তাকদির নির্ধারণ এবং হাজার মাসের চেয়েও উত্তম ইবাদতের সুযোগ-সবকিছুই এ রাতের সঙ্গে জড়িত। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত শবে কদরের গুরুত্ব ও ফজিলত একজন মুমিনকে এ রাতের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হতে অনুপ্রাণিত করে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা, শবে কদর অনুসন্ধান করা এবং এ মহামূল্যবান রাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করা।
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

