Logo

ধর্ম

মিসওয়াক : আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০০:৪৪

মিসওয়াক : আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম

ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনবিধানই প্রদান করে না; এটি দৈনন্দিন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার ওপরও জোর দেয়। এই দিক থেকে মিসওয়াক বা দাঁত মাজা একটি বিশেষ সুন্নাহ ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে কেবল দন্ত স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায় না; বরং এটি একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও সামাজিক জীবনকেও উন্নত করে। মহানবী সা.-এর সুন্নাহ হিসেবে নিয়মিত মিসওয়াকের গুরুত্ব অসংখ্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

মিসওয়াকের অর্থ ও প্রকৃত তাৎপর্য: ‘মিসওয়াক’ হলো বিশেষ প্রাকৃতিক কাঠ বা দন্তমঞ্জন যা দাঁতের ও মুখের পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইসলামে মিসওয়াক ব্যবহারের অর্থ কেবল শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়; বরং এটি একটি সুন্নাহ ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়। মিসওয়াকের মাধ্যমে মুখ এবং দাঁত পরিশুদ্ধ থাকে, যা নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদতে খুশু অর্জনের সহায়ক।

কোরআনের আলোকে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব: যদিও কোরআনে সরাসরি মিসওয়াকের উল্লেখ নেই, তবুও আল্লাহ তাআলা মুখ ও শরীরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদের ভালোবাসেন।’ [সুরা বাকারা : ২২২] এখানে ‘পবিত্র’ বলতে শরীর, মুখ, অন্তর ও মন; সবই অন্তর্ভুক্ত। মিসওয়াক ব্যবহার করে মুখ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।

হাদিসের আলোকে মিসওয়াকের ফজিলত: মিসওয়াকের ব্যবহার সম্পর্কে মহানবী সা. অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমি মানুষকে কোনো কাজের মাধ্যমে বেশি খুশি হতে দেখতাম, তবে তা হতো মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] আরেক হাদিসে মহানবী সা. বলেন, ‘দূর্গন্ধমুক্ত মুখ ও সুগন্ধ মুখ প্রিয় আল্লাহর কাছে।’ [সুনানে আবু দাউদ] এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে, মিসওয়াক কেবল শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়; এটি আধ্যাত্মিক ও ইবাদতের ফজিলতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নামাজ ও মিসওয়াক: নামাজের খুশু অর্জনের জন্য মুখের পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয় এবং নামাজে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। হাদিসে এসেছে, ‘মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে নামাজে খুশু বৃদ্ধি পায়।’ [সহিহ বুখারি] এতে প্রমাণ হয়, মিসওয়াক শুধু শারীরিক নয়; এটি আধ্যাত্মিক ও নেক কাজের সহায়ক।

সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব: মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে মুখ ও দাঁতের রোগের ঝুঁকি কমে। এছাড়া, এটি সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে, কারণ পরিচ্ছন্ন মুখ অন্যকে অমায়িক এবং বন্ধুসুলভ অনুভব করায়। মহানবী সা. বলেন, ‘বান্দার মুখ সুগন্ধময় হলে, তার সৎকর্ম দ্বিগুণ হয়।’ [সুনানে তিরমিজি]

মিসওয়াকের সময় ও ব্যবহার: হাদিস অনুযায়ী মিসওয়াক ব্যবহারের জন্য বিশেষ সময়গুলো- নামাজের পূর্বে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে খুশু বৃদ্ধি করে। রোজার পূর্বে ও পরে মুখের সতেজতা বজায় রাখে। সঙ্গম বা আলোচনা পূর্বে সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। মিসওয়াক ব্যবহারের নিয়ম হলো- পরিষ্কার কাঠ বা প্রাকৃতিক মিসওয়াক ব্যবহার করা। ব্যবহার পূর্বে নরম করা। নিয়মিত পরিবর্তন করা।

আত্মশুদ্ধি ও মিসওয়াক: মিসওয়াক ব্যবহার আত্মশুদ্ধির একটি অংশ। মুখ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে অন্তরও পবিত্র থাকে। হাদিসে এসেছে, ‘মুখের পরিচ্ছন্নতা হলো ঈমানের অর্ধেক।’ [সহিহ মুসলিম] অতএব, মিসওয়াক ব্যবহার শুধুমাত্র শারীরিক নয়; এটি ঈমান ও নেক আমলের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

ফজিলত ও নেক সওয়াব: মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে যে ফজিলত অর্জিত হয়Ñ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। নামাজে খুশু বৃদ্ধি। আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। সুগন্ধ ও স্বাস্থ্যকর মুখ। হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘মিসওয়াক ব্যবহার করা মুমিনের জন্য প্রতিদিন নেকি বৃদ্ধি করে।’ [সুনানে আবু দাউদ]

দৈনন্দিন জীবনকে উন্নত করে: মিসওয়াকের ব্যবহার একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনকে শারীরিক ও আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত করে। এটি ইসলামের সুস্থ জীবনধারার অংশ, যা নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য নেক কাজের খুশু বৃদ্ধি করে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণিত, মিসওয়াকের মাধ্যমে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে আত্মশুদ্ধি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব। অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর