রমজান-পরবর্তী জীবন
ইবাদত হোক দৈনন্দিন অভ্যাস
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৯
আলহামদুলিল্লাহ! ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাস আমরা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছি। এক মাসের সিয়াম সাধনা, আত্মত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের অনুশীলন একজন মুমিনের জীবনে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। তবে মনে রাখতে হবে- রমজান শেষ হলেও ইবাদত শেষ নয়; বরং এখান থেকেই প্রকৃত ধারাবাহিকতার পরীক্ষা শুরু।
মহান আল্লাহ বলেন- আর তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাক, যতক্ষণ না তোমার কাছে মৃত্যু আসে। (সূরা আল-হিজর: ৯৯) এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, ইবাদত কোনো মৌসুমি বিষয় নয়। বরং এটি একটি আজীবন চলমান দায়িত্ব।
রমজানের শিক্ষা: সারা বছরের পাথেয়
রমজানে আমরা যে আত্মসংযম, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও তাকওয়া অর্জন করি, তা যদি বছরের বাকি সময়েও ধরে রাখতে পারি, তাহলেই রমজানের প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হবে। অন্যথায় রমজান শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান মধ্যবর্তী গুনাহগুলো মুছে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়।"(সহিহ মুসলিম: ২৩৩)এ হাদিস আমাদেরকে নিয়মিত ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
মৃত্যুর পরও চলমান তিনটি আমল
মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি আমল অব্যাহত থাকে যা একজন মুমিনের জন্য চিরস্থায়ী সওয়াবের উৎস। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনড়মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি ছাড়া- সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)
১. সদকায়ে জারিয়া: এটি এমন দান, যার উপকার দীর্ঘদিন চলতে থাকে। যেমন- মসজিদ নির্মাণ, কূপ খনন, রাস্তা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন- তোমরা যা কিছু কল্যাণে ব্যয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা ভালোভাবেই জানেন। (সূরা আল-বাকারা: ২:২৭৩) ২. উপকারী জ্ঞান: মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে এমন জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া- বই লেখা, শিক্ষা দেওয়া, দাওয়াহ কার্যক্রম পরিচালনা- এসবের সওয়াব মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। ৩. নেক সন্তান: সন্তানকে দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
আল্লাহ বলেন- হে আমার রব। তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সুরা আল-ইসরা: ১৭:২৪)
শাওয়ালের ছয় রোজা: বছরের সমপরিমাণ সওয়াব আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল। "(সহিহ মুসলিম: ১১৬৪) তবে শর্ত হলো- রমজানের সব ফরজ রোজা পূর্ণ করতে হবে। কাজা থাকলে আগে তা আদায় করা উত্তম।
রমজানের পর যেসব আমল অব্যাহত রাখা জরুরি
ইবাদতের ধারাবাহিকতা
* পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায়।
* কোরআন তিলাওয়াত নিয়মিত করা।
* তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা।
* জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করা।
সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা।
প্রতি মাসে আইয়ামে বীজ (১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) রোজা রাখা।
সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব।
* বাবা-মায়ের খেদমত করা।
* আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ্য।
* প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া।
* অসহায় ও দরিদ্রদের সহযোগিতা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।" (মুসনাদ আহমাদ: ১২৫৭৯)
চরিত্র সংশোধন
* সত্যবাদিতা বজায় রাখা।
* আমানত রক্ষা করা।
হারাম ও সন্দেহজনক কাজ থেকে দূরে থাকা।
* অহংকার ও হিংসা পরিহার করা।
আল্লাহ বলেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।" (সূরা আন-নাহল: ১৬:৯০)
পরিশেষে বলতে চাই, রমজান মাস আমাদেরকে যে তাকওয়া, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়, তা যদি আমরা সারা বছর জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তবেই এই রমজান আমাদের জন্য সফলতার কারণ হবে। রমজান শুধুমাত্র একটি মাস নয়; এটি একটি জীবনব্যবস্থা, যা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে পরিচালিত করে।
আসুন আমরা অঙ্গীকার করি- রমজানের আমলগুলোকে সাময়িক নয়, স্থায়ী জীবনের অংশে পরিণত করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন, আমাদের আমলগুলো কবুল করুন এবং মৃত্যুর পরও অব্যাহত সওয়াবের ব্যবস্থা করে দিন। আমিন।
লেখক: ইসলাম বিষয়ক কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

