শাওয়াল মাসের পরিচিতি: মহিমান্বিত রমজানের পরেই আগমন ঘটে শাওয়ালের। আরবি বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে দশম মাস শাওয়াল। হজের মাস সমূহের মধ্যেও একটি। শাওয়াল মূলত আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ: উঁচু, উন্নত বা ভারি হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া, ইত্যাদি। প্রতিটি অর্থের সাথে শাওয়ালের সুগভীর সম্পর্ক আছে। কারণ এ মাসের আমলের দ্বারা উন্নতি লাভ হয়। নেকির পাল্লা ভারী হয়, গৌরব অর্জন হয়।সাফল্য আসে। একমাস ফরজ রোজা আদায় শেষে এ মাসে আরো কয়েকটি নফল রোজা আদায়ের প্রতি মনোনিবেশ করে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জন করা, পরিপক্ষতা ও স্থিতি লাভ করা, এসবই হলো শাওয়াল মাসে তার নামের যথার্থতা।
শাওয়াল মাসের আমল ও তার ফজিলত
এক.এ মাসের প্রথম আমল হল পহেলা দিবসে ঈদুল ফিতরের নামাজ ও ছদকায়ে ফিতর আদায়।
দুই. কোনো রোজা কাজা হয়ে গেলে, সেটা দ্রুত আদায় করে নেওয়া। কেননা, আজরাইল আলাইহিস সালাম যেকোনো সময় মেহমান হতে পারেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, প্রত্যেক বান্দার হায়াত সুনির্ধারিত। যখন নির্দিষ্ট সময় চলে আসবে তখন একমুহুর্তও বিলম্ব হবে না এবং ত্বরাও হবে না। (সুরা আরাফ-৩৪)
তিন. তারপর অগ্রগণ্য আমলটি হল এ মাসে ছয়টি রোজা রাখা। যে সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজাগুলো রাখবে অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখবে, সে পূর্ণ বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। ( মুসলিম-১১৬৪,আবু দাউদ -২৪৩৩) অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে, হজরত উবাইদুল্লাহ রা: বলেন , একদিন রাসুল সা:-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ সা: আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব?’ তখন রাসুল সা: বললেন, ‘তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের ছয় রোজা রাখো, তা হলেই তুমি সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে।(তিরমিজি-১৫৩৪)
চার.এছাড়াও শাওয়াল মাসে বিয়ে-শাদী করা সুন্নত। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহ আনহার আকদ এ মাসে কোনো এক শুক্রবার মসজিদে নববীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ( মুসলিম-৩৩৫২) এছাড়াও উম্মে ছালমা ও ছাউদা বিনতে যামআ রাযিঃ কেও শাওয়াল মাসে বিয়ে করেছিলেন (মুসলিম-১৪২৩) অতএব শুভকাজের সূচনার জন্য এ মাস খুবই উপযোগী। শাওয়াল মাসে ও জুমুয়ার দিনে মসজিদে বিবাহ সম্পাদন করা সুন্নাত। উল্লেখ্য, সকল মাসের যে কোন দিন বিবাহ করা যায়িজ আছে। (মুসলিম ১৪২৩/ বায়হাকী ১৪৬৯৯)
পাঁচ. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি প্রিয় অভ্যাস; তিনি প্রেত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন। সুতরাং এ মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখেও রোজা রাখার চেষ্টা করা। (বুখারী -১৯৮০ আবু দাউদ- ২৪৪৯, মুসনাদে আহমাদ -২৩০৭০)
ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন
এক.শাওয়ালের ছয় রোজাকে অনেকে সাক্ষী রোজা নামে অভিহিত করেন এটা শরিয়াত স্বীকৃত নাম নয় কোরআন হাদিসের কোথাও এ নামের উপস্থিতি পাওয়া যায় না অতএব বর্জন করা অত্যাবশ্যকীয়।
দুই.সাথে সাথে অনেকে এ ছয় রোজাকে মহিলাদের জন্য বিশেষ মনে করেন। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা বৈ কিছুই নয়। এ রোজা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেখেছেন এবং উম্মতকে রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এর প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য নির্ধারণ করেছেন সমানভাবে।
যেভাবে রাখতে হবে এ রোজা
শাওয়াল মাসের যেকোনো সময় এই রোজা আদায় করা যায়। ধারাবাহিকভাবে বা বিরতি দিয়ে। স্মর্তব্য, রমজানের রোজা ছাড়া অন্য সব রোজারে নিয়েত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করতে হয়। তবে ঘুমানোর পূর্বে অন্তরে যদি দৃঢ় নিয়েত থাকলে, সাহরী না করতে পারলেও রোজা হবে। (ফতওয়ায়ে শামি)
এবং রমজানের ছুটে যাওয়া রোজা কাজা করার আগেও নফল রোজা রাখা যায়। তবে সম্ভব হলে ফরজ রোজার কাজা আগেই আদায় করাই উত্তম। (ফাতহুল কাদীর -২/৩১১,ফাতওয়ায়ে ইসলামিয়া ২/১৬৬)
উপসংহার
শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার পরিচায়ক। কারণ আল্লাহ তায়ালা বান্দার আমল কবুল করলে তাকে আরো নেক আমলের তৌফিক দেন। আর অধিক পরিমাণ নেক আমল দ্বারা অন্তরের অর্জন হয়।আল্লাহর ভালোবাসা মহব্বত বৃদ্ধি পায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক- ত্রৈমাসিক রাহবার

