Logo

ধর্ম

ইসলামে দাড়ি রাখার গুরুত্ব

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৬

ইসলামে দাড়ি রাখার গুরুত্ব

ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, আর এই জীবনবিধানের বাস্তব রূপায়ণ করেছেন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি তাঁর প্রতিটি কর্ম, পদ্ধতি ও কথাবার্তার মাধ্যমে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন। তাই আমাদের উচিত তাঁর প্রদর্শিত পথ—আল-কোরআন ও হাদিস শরিফ আঁকড়ে ধরে সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা।

আজ এটা স্পষ্ট যে, কোরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে থাকার কারণেই মুসলিম জাতির মধ্যে অধঃপতন দেখা দিয়েছে। সর্বত্র বিভেদ, দলাদলি ও মতবিরোধ। এসব দূর করতে হলে কোরআন ও সুন্নাহর পথে ফিরে আসা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

ধর্মীয় মতপার্থক্যের বিষয় প্রকৃতপক্ষে খুবই সীমিত। কিন্তু এগুলোকে কেন্দ্র করে অনেকে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ব্যাখ্যা দিয়ে নতুন নতুন মতবাদ তৈরি করেছে। বর্তমানে ইসলামি রাজনীতি, দাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ, পীর-মাজার ও জিহাদ—এসব বিষয় নিয়ে বেশি বিতর্ক দেখা যায়। বিশেষ করে দাড়ি ও পোশাকের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বেশি।

চার ইমামসহ অধিকাংশ আলেমের মতে দাড়ি রাখা ‘ওয়াজিব’। কিছু সংখ্যক আলেম একে সুন্নাহ বলেছেন। তবে কেউই দাড়ি না রাখাকে বৈধ মনে করেন না; বরং এটিকে গোনাহ হিসেবে গণ্য করেন।

কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু তথাকথিত ‘মডারেট’ মুসলিম দাড়ি রাখাকে জরুরি মনে করেন না। তাঁদের মধ্যে এ বিষয়ে বিরূপ মনোভাব দেখা যায়। অনেকেই সুন্নাহ জেনে অবহেলায় দাড়ি রাখেন না, আবার কেউ কেউ দাড়ি রাখলেও সুন্নাহসম্মতভাবে রাখেন না।

তাদের উদ্দেশ্যে বলা যায়—যদি কেউ দাড়িকে সুন্নাহ জেনে অবজ্ঞাভরে বর্জন করে, তবে তা ঈমানের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। অনেকেই ব্যক্তিগত বা সামাজিক সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরেন। আবার কেউ কেউ দাড়িকে অপ্রয়োজনীয় বা বিরক্তিকর মনে করেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা মারাত্মক গোনাহের কারণ হতে পারে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি রেখেছেন আল্লাহর নির্দেশ পালন হিসেবে। সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমও তা অনুসরণ করেছেন। সুতরাং এ বিষয়ে সন্দেহ বা অবহেলার কোনো অবকাশ নেই।

আবার কেউ কেউ দ্বীনের দোহাই দিয়ে দাড়ি রাখেন না। তারা মনে করেন, দাড়ি রাখলে সাধারণ মানুষের কাছে দাওয়াত দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। মানুষ মনে করতে পারে—ইসলাম মানেই দাড়ি, টুপি ও জুব্বা। ফলে তারা ইসলাম গ্রহণে অনীহা দেখাতে পারে।

এই যুক্তির জবাবে প্রখ্যাত আলেম ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) তাঁর “কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পোশাক, পর্দা ও দেহসজ্জা” গ্রন্থে বলেন—এ ধরনের যুক্তি বিপজ্জনক। এভাবে যুক্তি দাঁড় করালে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর হারাম কাজকেও বৈধ বলে দাবি করা হতে পারে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছিলেন? সাহাবায়ে কেরাম কি দাড়ি মুণ্ডন করেছিলেন? কখনোই নয়। তাঁরা দ্বীন প্রচার করেছেন—মানুষ গ্রহণ করুক বা না করুক। কারণ হেদায়াতের মালিক আল্লাহ তাআলা।

যার অন্তরে আল্লাহ হেদায়াত দেন, সে দাড়ি, টুপি বা জুব্বা দেখে দ্বীন থেকে দূরে সরে যায় না; বরং তা গ্রহণ করে। তাই দাড়ি না রাখার জন্য এ ধরনের দুর্বল যুক্তি উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

এবার দাড়ির পরিমাণ সম্পর্কে বলা যায়—অনেকে দাড়ি একেবারে ছোট করে রাখেন, যেন শুধু দাড়ি আছে বোঝা যায়। তারা মনে করেন, সামান্য দাড়ি থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু এটি সঠিক ধারণা নয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি বড় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন— ‘তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা করো; দাড়ি বড় করো এবং গোঁফ ছোট করো।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসেও গোঁফ ছোট রাখা এবং দাড়ি বড় রাখার কথা বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে এসেছে—মানবজাতির স্বভাবগত (ফিতরাত) দশটি কাজের মধ্যে গোঁফ ছাঁটা ও দাড়ি বড় রাখা অন্যতম।

এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দাড়ি মুণ্ডন করা বা অস্বাভাবিকভাবে ছোট রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব, আমাদের উচিত এ বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা। অন্যথায় বিদআত উদ্ভাবনের কারণে পরকালে লাঞ্ছনার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১. খুতবাতুল ইসলাম — ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

২. কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পোশাক, পর্দা ও দেহসজ্জা

৩. এহইয়াউস সুনান — আল-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ

লেখক: প্রাবন্ধিক, কামিল/এম.এ

সালনা, গাজীপুর

ইমেইল: jony90siddique@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন