Logo

ধর্ম

ব্যস্ততা : নীরব এক অজুহাত

Icon

মাসউদুল হক শিবলী

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮

ব্যস্ততা : নীরব এক অজুহাত

“সময় নেই” আধুনিক সমাজে মানুষের মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বাক্য সম্ভবত এটাই। অফিস, ব্যবসা, পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ, সবকিছুর চাপে মানুষ নিজেকে এমন এক ব্যস্ততার মধ্যে আবদ্ধ মনে করে, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ারও ফুরসত নেই। এই ব্যস্ততার ভিড়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দিন দিন অবহেলিত হয়ে পড়েছে। আর তা হলো ইবাদত।

নামাজের সময় হলে আমরা বলি, “এখন একটু কাজ আছে, পরে পড়ব।” কোরআন তিলাওয়াতের কথা উঠলে বলি “সময় পেলে করব।” কিন্তু সেই ‘পরে’ আর আমাদের জীবনে আসে না। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, জীবন এগিয়ে চলে মৃত্যুর দিকে। ধীরে ধীরে ইবাদত আমাদের জীবনের প্রান্তিক বিষয়ে পরিণত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি আমাদের সময় নেই? নাকি আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে রেখেছি?

ইবাদত: জীবনের কেন্দ্র নাকি প্রান্তিক অনুষঙ্গ

ইসলাম মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”(সূরা যারিয়াত: ৫৬) তার মানে ইবাদত কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের মূল কারণ। অথচ আমাদের বাস্তব জীবন এই সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চিত্র তুলে ধরে। আমরা দুনিয়াবি কাজকে করেছি জীবনের কেন্দ্র, আর ইবাদতকে বানিয়েছি অবসর সময়ের একটি ‘ঐচ্ছিক’ বিষয়। আমরা মনে করি সব কাজ শেষ হলে, যদি একটু সময় বাঁচে, তবে নামাজ পড়ব, কোরআন তিলাওয়াত করব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুনিয়ার কাজ কখনো শেষ হয় না। ফলে ইবাদতের সেই সময়টুকুও আর ফিরে আসে না।

সময় সংকট: বাস্তবতা নাকি অগ্রাধিকারের সংকট

মানুষের জীবনে সময়ের অভাব প্রকৃতপক্ষে একটি আপেক্ষিক বিষয়। আমরা যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তার জন্য সময় বের করতে পারি। একজন প্রিয় মানুষের সাথে দেখা করতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে, কিংবা ব্যক্তিগত আগ্রহ পূরণ করতে, আমরা সব ব্যস্ততা সরিয়ে সময় বের করি। এর ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা কেমন মুসলমান? সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, অথচ নামাজের সময় হলেই অজুহাত। তার মানে কি মহান আল্লাহর বড়ত্ব, তাঁর কর্তৃত্ব আজও আমাদের মনে যথাযথ ভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি? রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, “কিয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।” (তিরমিজি: ৪১৩)

যে আমলটি আখিরাতে প্রথম জিজ্ঞাসিত হবে, সেটিই যদি আমাদের জীবনে সবচেয়ে অবহেলিত হয়, তবে এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে? এই বাস্তবতা আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে, সমস্যা সময়ের নয়; সমস্যা আমাদের চিন্তায়, সমস্যা আমাদের অগ্রাধিকারে। এই অগ্রাধিকারের সংকটকে আরও গভীর করেছে আধুনিক প্রযুক্তি।

প্রযুক্তি: সময় বাঁচানোর মাধ্যম নাকি সময় নষ্টের ফাঁদ

আমাদের হাতে আজ স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, আধুনিক প্রযুক্তি, যা আমাদের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রেই সহজ করে তুলেছে। এসবের সাহায্যে অনেক কঠিন কাজও এখন মূহুর্তের মাঝেই করে ফেলা যাচ্ছে। আবার সেই প্রযুক্তির অপব্যবহারেই সবচেয়ে বেশি নষ্ট হচ্ছে, আমাদের মূল্যবান সময়। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন ও সাফল্য দেখে কাটিয়ে দিই। অথচ নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবার জন্য কয়েক মিনিট সময় বের করতে পারি না। এই অবস্থাকে আল্লাহ তাআলা কোরআনে “গাফলত” বা উদাসীনতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গাফলতই আমাদের প্রকৃত ব্যস্ততা। যা আমাদেরকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। জীবনের মূল উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দেয়। অহেতুক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আমাদেরকে অন্তসারশূন্য করে তোলে। অথচ এই মেকি ব্যবস্থাটাকেই আমরা ‘স্বাভাবিক জীবন’ বলে মনে করি।

যদি আমরা সাহাবায়ে কেরামের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাবো। তারা আমাদের মতোই মানুষ ছিলেন, বরং অনেক দিক থেকে তাদের জীবন ছিল আরও কঠিন। তারা ব্যবসা করেছেন, যুদ্ধে গিয়েছেন, পরিবার-পরিজনের হক সঠিকভাবে আদায় করার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্বও আঞ্জাম দিয়েছেন। তাদের কাছে আধুনিক সুবিধা ছিল না, ছিল না বিদ্যুৎ কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তবুও তাদের জীবনে ইবাদতের কোনো ঘাটতি ছিল না। পবিত্র কোরআনে তাদের সম্পর্কেই এসেছে: “তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে; তারা তাদের রবকে ভয় ও আশা নিয়ে ডাকে।” (সূরা সাজদাহ: ১৬)

রাতের নিস্তব্ধতায় পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে থাকতো, তারা তখন দাঁড়িয়ে যেতো জায়নামাজে, মহান রবের সামনে। একনিষ্ঠভাবে, জীবনের সমস্ত মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। তাদের কাছে ইবাদত ছিল না কোনো দায়িত্বের বোঝা; বরং ছিল আত্মার প্রশান্তি, হৃদয়ের শান্তি। এই তুলনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে, আমরা কি সত্যিই তাদের চেয়ে বেশি ব্যস্ত?

দুনিয়ার মোহ: প্রকৃত ব্যস্ততার উৎস

আল্লাহ তাআলা বলেন: “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে বিভোর করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরসমূহে পৌঁছাও।” (সূরা তাকাসুর: ১-২) এই আয়াত আমাদেরকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা প্রতিনিয়ত দৌঁড়ে বেড়াচ্ছি অর্থ, সম্পদ, সম্মান আর সামাজিক অবস্থানের পেছনে। অথচ এগুলোর কোনটাই চিরস্থায়ী নয়। এই অর্থহীন প্রতিযোগিতা আমাদেরকে এতটাই গ্রাস করে ফেলেছে, যে আমরা আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য আখিরাত সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছি। আমরা শুধু ছুটে চলেছি; দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। আমরা ভাবি, আরও একটু সফল হলে, আরেকটু স্থির হলে, তখন ইবাদতের দিকে মনোযোগ দেব। কিন্তু এই “আরও একটু” কখনো শেষ হয় না। কারন দুনিয়ার মোহ এমন এক অতল কূপের নাম, যার তলদেশ আজীবন অধরাই রয়ে যায়। 

ইবাদত কেবল আখিরাতের জন্য নয়; এটি দুনিয়ার জীবনেও বরকত নিয়ে আসে। একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে: “হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে অবসর করো, আমি তোমার হৃদয়কে প্রাচুর্যে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য দূর করে দেব।” (সুনান তিরমিজি: ২৪৬৬) এই হাদিস আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, আমরা যে অভাব পূরণের জন্য দৌড়াচ্ছি, সেই অভাব পূরণের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। অথচ উচ্চারণে কিংবা আচরণে, স্বশব্দে অথবা মৌনভাবে আমরা তা উপেক্ষা করে চলেছি। 

ছোট আমল, বড় পরিবর্তন

ইবাদতের জন্য আপনাকে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে একেবারে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করতে হবে না। বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, শুধু মানসিকতা পরিবর্তন করুন। হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম জাগিয়ে তুলুন। তাহলে ছোট আমলই আমাদেরকে বদলে দিবে। তা ছাড়া যে কোনো পরিবর্তনের সূচনা অল্প দিয়েই হয়।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা। প্রতিদিন অল্প হলেও কোরআন তিলাওয়াত করা। চলার পথে জিকির করা। ঘুমানোর আগে ইস্তিগফার ও দুরুদ শরিফ পড়া।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন: “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেটি, যা নিয়মিত করা হয়। যদিও তা পরিমাণে অল্প থাকে।” (বুখারি: ৬৪৬৪) এই ধারাবাহিকতাই একজন মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। অল্প সময়ের ইবাদতও যদি নিয়মিত হয়, তবে তা হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।

মৃত্যুর বাস্তবতা: শেষ সময়ের অনিশ্চয়তা

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো মৃত্যু। এটি এমন একটি বাস্তবতা, যা কখনোই অস্বীকার করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন: “কেউ জানে না, সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে; এবং কেউ জানে না, সে কোন ভূমিতে মৃত্যু বরণ করবে।” (সূরা লুকমান: ৩৪) এই অনিশ্চয়তা আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়, ইবাদতকে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ সেই ভবিষ্যৎ আমাদের নাও মিলতে পারে। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত মানুষ চলে যাচ্ছে, কোন রকম আগাম সতর্কবার্তা না দিয়ে, হঠাৎ করে, অপ্রত্যাশিতভাবে। তাদেরও হয়তো অনেক পরিকল্পনা ছিল, অনেক ব্যস্ততা ছিল। কিন্তু মৃত্যু এসে সব পরিকল্পনাকে থামিয়ে দিয়েছে।

উপসংহার:

ব্যস্ততা কোনো সমস্যা নয়; এটি জীবনের একটি অংশ। সমস্যা হলো, আমরা এই ব্যস্ততাকে একটি অজুহাতে পরিণত করেছি। আমরা নিজেদেরকে বোঝাই সময় নেই, সুযোগ নেই, পরে করবো। অথচ সত্য হলো আমরা চাইলে সময় বের করতে পারি। আমাদের প্রয়োজন একটি সিদ্ধান্ত; আজ থেকেই, এখন থেকেই, অল্প সময় হলেও আল্লাহর জন্য আলাদা করে রাখবো। ভুলে গেলে চলবে না, এই সম্পদ, অবস্থান আর ব্যস্ততা, দুনিয়াতেই থেকে যাবে। কবর পর্যন্ত যাবে শুধু আমাদের আমল।

আজ যদি আমরা পাঁচ মিনিট সময় বের করতে পারি; নামাজের জন্য, জিকিরের জন্য, কোরআনের জন্য। তবে সেই পাঁচ মিনিটই হতে পারে আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ। ব্যস্ততা থাকবেই। কিন্তু সেই ব্যস্ততার ভিড়ে ভুলে গেলে চলবে না, আল্লাহর দাসত্বই আমাদের মূল পরিচয়। কারণ শেষ পর্যন্ত, আমাদের জীবনের সফলতা ব্যস্ততার বাটখারা দিয়ে মাপা হবে না। বরং সফলতা নির্ধারিত হবে, ব্যস্ততার মাঝেও কে কতটা আল্লাহকে স্মরণ করতে পেরেছি, তার ওপর।

লেখক: আলেম, শিক্ষক, লেখক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন