Logo

ধর্ম

​হাদিসের প্রমাণ, সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা

Icon

​যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩০

​হাদিসের প্রমাণ, সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা

​মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন— "তিনি (নবিজি) নিজ থেকে (দ্বীন বিষয়ে) কোনো কথা বলেন না। যা বলেন, ওহি করা হলেই তবে বলেন।" (সুরা নাজম, ৫৩:৩-৪)

​মহাগ্রন্থ আল কুরআনের মতো নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহও শরিয়তের মূলনীতি। কুরআনের পরই হাদিসের স্থান। কুরআন মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয় আর তিনি হুবহু তা বর্ণনা করেন। হাদিসও তেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর হৃদয়ে উদিত করে দেন আর তিনি তা নিজ ভাষায় প্রকাশ করেন। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন— "রাসুল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ করো এবং যা তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।" (সুরা হাশর, ৫৯:৭)

​তিনি আরো বলেছেন— "যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল।" (সুরা নিসা, ৪:৮০)

​পবিত্র কুরআনে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ শরিয়তের অন্যান্য বিধি-বিধান পালন করা ফরজ-ওয়াজিব করা হয়েছে। কিন্তু হাদিসে সেগুলোর নিয়ম-কানুন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদি হাদিসের অস্তিত্ব না থাকত, তবে নামাজ কীভাবে পড়তে হয়—আমরা কখনো তা জানতাম না। রোজা রাখার নিয়মই বা কী? সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতাম। হজ-জাকাতসহ মহান আল্লাহ পাকের অন্যান্য নির্দেশ পালন করা আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর হয়ে যেত। হাদিস হচ্ছে কুরআনের বিশদ ব্যাখ্যা। মহান আল্লাহ বলেন— "আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি শুধু এজন্য যে, তুমি তাদেরকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দেবে যেসকল বিষয়ে তারা মতভেদ করে এবং (এটি নাজিল করেছি) মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও রহমত স্বরূপ।" (সুরা নাহল, ১৬:৬৪)

​যদি কেউ কুরআন ও হাদিস দুটিই আঁকড়ে ধরে রাখে, তবে সে কভু পথভ্রষ্ট হবে না। বিদায় হজের ভাষণে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন— "আমি তোমাদের মাঝে ছেড়ে যাচ্ছি দুটি বস্তু। যতদিন তোমরা এ দুটি বস্তু আঁকড়ে থাকবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবির সুন্নাহ।" (মিশকাত, হাদিস নং: ১৮৬)

​‘আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাকালীন হাদিস লিপিবদ্ধ হয়নি; বরং তাঁর পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার শতাব্দীকাল পর লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই রাসুলের মুখনিঃসৃত সহিহ হাদিস এখন খুঁজে পাওয়া দুরূহ’—এ ধরনের কথাবার্তা একদম ভিত্তিহীন। কারণ, ইসলামের সূচনাকালে কুরআনের সাথে হাদিস মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার ভয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদিও হাদিস লিখে রাখতে সাহাবিগণকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, কিন্তু কুরআনের সাথে হাদিস মিশ্রিত হওয়ার ভয় যেখানে ছিল না, সেক্ষেত্রে তাঁর জীবদ্দশায়ই হাদিস লিখে রাখতে তিনি আপন সাহাবিগণকে প্রবল উৎসাহিত করেছেন। ফলে হাদিস লিখে রাখার ধারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই শুরু হয়ে যায় এবং সাহাবিগণ হাদিস লেখা আরম্ভ করে দেন।

​তাছাড়া হাদিস সংরক্ষিত করার আরেকটি পদ্ধতি ছিল আল্লাহ প্রদত্ত প্রখর মেধা ও স্মৃতিশক্তি। জাহেলি জামানায় ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যেসকল মানুষ ছিলেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন এ গুণে গুণান্বিত। একবার যে কথাটি তাঁদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করত, আজীবন তাঁরা তা মনে রাখতে পারতেন। তাই তো ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, হাজার হাজার কবিতার লাইন তাঁদের মুখস্থ ছিল। নিজেদের বংশধারা এমনকি পালিত পশুগুলোর বংশধারাও তাঁদের সম্পূর্ণ আত্মস্থ ছিল।

​তাঁদের মধ্য থেকে যাঁরা আল্লাহ তাআলার ওপর ইমান আনলেন, তাঁরা হয়ে গেলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথি, তাঁর প্রিয় সাহাবি। আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন যে কথাটি বলতেন, যে আমলটি করতেন, তা উপস্থিত সাহাবিগণ হৃদয়ঙ্গম করে নিতেন। তখন যেসকল সাহাবি সেখানে উপস্থিত থাকতেন না, তাঁদের কাছে উপস্থিত সাহাবিগণ সেই সংবাদ পৌঁছে দিতেন; অথবা তাঁরা নিজেরাই এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শুনে নিতেন, আমল শিখে নিতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই এভাবে হাদিসচর্চা আরম্ভ হয়।

​সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে আহরিত হাদিসসমূহ পরবর্তী প্রজন্মদের সঠিকভাবে শিক্ষা দান করেন। এ প্রজন্মদেরই ‘তাবেয়ি’ নামে অভিহিত করা হয়। আর তাবেয়ির কাছ থেকে যাঁরা হাদিস শিক্ষা লাভ করেন, তাঁদেরকে ‘তাবে তাবেয়িন’ বলা হয়।

​হিজরি দ্বিতীয় শতকের প্রারম্ভ থেকে অসংখ্য কনিষ্ঠ তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িনগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাহাবায়ে কেরাম ও প্রবীণ তাবেয়িগণ কর্তৃক বর্ণিত ও লিখিত হাদিসসমূহ ব্যাপকভাবে জমা করতে থাকেন। হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত সময়ে ব্যাপকভাবে হাদিসচর্চা আরম্ভ হয়। এ সময়েই সহিহ বুখারি, মুসলিমসহ নির্ভরযোগ্য ছয়টি হাদিসের কিতাব লেখা হয়।

​ইমাম বুখারি প্রায় সময়ই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখতেন। একদা তিনি স্বপ্নে দেখতে পেলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাতপাখা দিয়ে তাঁকে বাতাস করে তাঁর পবিত্র শরীর থেকে মাছি তাড়িয়ে দিচ্ছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাদাতাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে সম্পর্কিত মিথ্যা কথাগুলো থেকে সহিহ কথাগুলো আপনি বের করে আনবেন।’ অর্থাৎ জাল হাদিস থেকে সহিহ হাদিস আলাদা করবেন। এই স্বপ্নের কথা সে যুগের অনেক আল্লাহওয়ালার কাছে প্রকাশ করলে তাঁরাও একই কথা বললেন। এরপর ইমাম বুখারির উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ একটি সহিহ হাদিসের কিতাব সংকলন করতে তাঁকে উৎসাহ প্রদান করেন। উস্তাদের সুপরামর্শে ইমাম বুখারি হাদিস লিপিবদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত হন। তাঁর লক্ষ্য যেহেতু একদম সহিহ-নির্ভুল হাদিস সংকলন করা, তাই সে অনুযায়ীই তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। যাচাই-বাছাই না করে দশজনের কাছ থেকে শুনে শুনে হাদিস লিপিবদ্ধ করার মানুষ তিনি নন। বুখারি শরিফ রচনাকালে প্রত্যেক দিন তিনি নফল রোজা রাখতেন এবং প্রতিটি হাদিস লেখার পূর্বে গোসল করে দুরাকাত নফল নামাজ আদায় করে মুরাকাবার মাধ্যমে হাদিসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতেন। মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইঙ্গিতপ্রাপ্ত হয়ে তারপর তিনি হাদিসটি লিপিবদ্ধ করতেন। প্রতিটি হাদিস লেখার পূর্বে উক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন বিধায় বুখারি শরিফ রচনার কাজে তাঁর ষোলটি বছর ব্যয় হয়েছে। তিনি ছিলেন রিজাল শাস্ত্রে দক্ষ ব্যক্তি।

​রিজাল শাস্ত্র হলো হাদিসের সনদ সম্পর্কে জ্ঞান। সেসব হাদিসই তিনি স্বীয় কিতাবে সন্নিবেশিত করেন, যেগুলো উপযুক্ত দলিল-প্রমাণসহ সহিহ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং নির্ভেজাল সনদসূত্রে অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাঁর পর্যন্ত প্রাজ্ঞ হাদিস বিশারদ উস্তাদ পরম্পরায় পৌঁছেছে। প্রত্যেকটি হাদিস তিনি সনদসহকারেই স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

​সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বোঝানোর জন্য মাসিক আল-কাউসার থেকে সংগৃহীত একটি আর্টিকেলের আংশিক হুবহু উল্লেখ করছি—

​‘‘সহিহ বুখারির গ্রন্থকার ইমাম বুখারি ইন্তেকাল করেন ২৫৬ হিজরিতে। এখন চলছে ১৪৪৭ হিজরি। তো এই গ্রন্থটি হাজার বছরেরও অধিক কাল ব্যবধান মোচন করেছে। এই গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা যেন সরাসরি ইমাম বুখারির নিকট থেকে হাদিস শ্রবণ করা। আর যেহেতু ইমাম বুখারি নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত তাঁর সূত্র লিপিবদ্ধ করেছেন, তো আমরা নির্ভরযোগ্য ও অবিচ্ছিন্ন সূত্র নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ও কর্ম পর্যন্ত পৌঁছতে পারছি। যদিও এখানে কালের ব্যবধান প্রায় দেড় হাজার বছরের, কিন্তু আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক মুহূর্তের জন্য বিচ্ছিন্ন হইনি।

​নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা-কাজ এবং তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি সবই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। তাই হাদিস শরিফ হচ্ছে নবি-জীবনের বিশদ বিবরণ। হাদিস শরিফ যেমন শরিয়তের বিধিবিধানের উৎস, তেমনি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি, তাঁর আচার-ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়েরও মূল্যবান দলিল। নবি-জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সকল ঘটনাই বিস্তারিতভাবে হাদিসের কিতাবসমূহে বিদ্যমান রয়েছে।

​হাদিস শরিফের প্রতিটি তথ্য, প্রত্যেকটা বিবরণ পরীক্ষিত ও প্রমাণিত এবং সকল তথ্যের সম্পূর্ণ সূত্র (সনদ) সংরক্ষিত। হাদিস শরিফের মৌলিক গ্রন্থগুলো খুললেই দেখা যাবে, প্রত্যেকটি হাদিস—অন্য ভাষায় নবি-জীবনের প্রত্যেকটি তথ্যের সঙ্গে সনদ বা সূত্র-পরম্পরা উল্লেখিত হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো গ্রন্থকার থেকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের সবার নাম উল্লেখিত রয়েছে। শুধু তাই নয়, অত্যন্ত মৌলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরীক্ষাও করা হয়েছে।

​এই বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য আমরা আলোচনা করতে পারি যে, মুহাদ্দিসগণ একটি বর্ণনা কখন গ্রহণ করেন? তাঁরা প্রথমেই তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করেন। সেই প্রশ্নগুলো হচ্ছে— ১. মূল ঘটনা পর্যন্ত সূত্র (সনদ) বিদ্যমান আছে কি না এবং সনদের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য কি না? ২. সূত্রটি (সনদ) সব ধরনের বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত কি না? ৩. (সনদ) বা বক্তব্য ওইসব ত্রুটি (ইল্লত) থেকে মুক্ত কি না, যা একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর ভুলভ্রান্তি কিংবা অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি হয়?

​এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে প্রথম প্রয়োজন সনদ বিদ্যমান থাকা। সনদ নেই তো বর্ণনা বাতিল। দ্বিতীয় প্রয়োজন সনদের সকল বর্ণনাকারীর পরিচয় ও নির্ভরযোগ্যতা-অনির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে অবগতি। এটি এক বিস্ময় যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের প্রতিটি তথ্য প্রামাণিক পন্থায় সংরক্ষণের জন্য মুহাদ্দিসগণ প্রায় এক লক্ষ রাবির (হাদিস বর্ণনাকারীর) জীবনী সংকলন করেছেন। তাঁদের সময়কাল, সততা-সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তি, হাদিসশাস্ত্রের চর্চা ও অভিজ্ঞতা, বর্ণনার মান ও পরিমাণ, উস্তাদ ও ছাত্রদের তালিকা, আবাস ও প্রবাসের বিভিন্ন তথ্য, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন, তাঁর সমসাময়িক কিংবা পরবর্তী যুগের ইমামুল হাদিসদের তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য ইত্যাদি সকল বিষয় সংকলিত হয়েছে। এই বিস্ময়কর শাস্ত্রটি ‘আসমাউর রিজাল’ নামে পরিচিত। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু শত শত মুহাদ্দিস এ কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ইসলাম-বিদ্বেষী গবেষকরা পর্যন্ত মুসলিম মনীষীদের এই অমর কীর্তিতে বিস্মিত ও হতবাক না হয়ে পারেননি। একটি প্রসিদ্ধ উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি। ডা. স্প্রেঙ্গার আল-ইসাবার ইংরেজি ভূমিকায় লেখেন— ‘পৃথিবীতে অতীতের কোনো জাতি এমন ছিল না, আজও নেই, যারা মুসলমানদের মতো আসমাউর রিজালের সুবিশাল শাস্ত্র প্রস্তুত করেছে। যার মাধ্যমে আজ পাঁচ লক্ষ মানুষের অবস্থা জানা যেতে পারে।’ (খুতবাতে মাদরাজ, পৃ. ৪৫)

​দ্বিতীয় প্রশ্ন সনদের বিচ্ছিন্নতা-অবিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গ। আসমাউর রিজাল শাস্ত্রে রাবির সততা ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে তার উস্তাদ-শাগরিদদের তালিকা, সময়কাল, কোথায় কোন শায়খের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ইত্যাদি তথ্য এজন্যই সংরক্ষণ করা হয়েছে যাতে সনদের বিচ্ছিন্নতা-অবিচ্ছিন্নতা নির্ণয় করা যায়। এছাড়া হাদিসের ইমামগণ এ বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে মনোযোগ দিয়েছেন। অসংখ্য সনদ পরীক্ষা করে কোনটা বিচ্ছিন্ন আর কোনটা অবিচ্ছিন্ন, এটা তাঁরা নির্ণয় করেছেন। তাঁদের এই ফয়সালাগুলো যেমন স্বতন্ত্র গ্রন্থ আকারে সংকলিত হয়েছে, তদ্রুপ আসমাউর রিজাল, শুরূহে হাদিস, ইলালুল হাদিস এবং যেসব গ্রন্থে সনদ বিষয়ক আলোচনা রয়েছে তাতেও সংকলিত হয়েছে।’’ (মাসিক আল-কাউসার)

​উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা আমরা নিশ্চয়ই খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, বুখারি শরিফসহ অন্যান্য সহিহ হাদিসের কিতাবসমূহ পরিত্যাজ্য নয়; বরং কুরআনের পরই সর্বাগ্রে অগ্রাধিকারযোগ্য।

​শরিয়তের চারটি মূলনীতির মধ্যে হাদিস দ্বিতীয় পর্যায়ের হওয়ায় হাদিস ব্যতীত ইসলামি শরিয়ত পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আর বর্তমানে সহিহ হাদিসের ওপর আমল করার জন্য আমরা বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফসহ অন্যান্য সহিহ হাদিসগ্রন্থসমূহের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো সুপ্রামাণিক পন্থায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।

​হিজরি চতুর্থ শতকে সহিহ ইবনে হিব্বান, সহিহ ইবনে খুজাইমা, মুসান্নাফুত তহাবি, মুসতাদরাক হাকিম, সুনানে দারে কুতনি, তাবারানির আল-মুজাম এবং আরও কয়েকটি হাদিসের কিতাব সংকলিত হয়। ৫ম হিজরি শতকে ইমাম বায়হাকির সুনানে কুবরা সংকলিত হয়। চতুর্থ শতকের পর থেকে এ পর্যন্ত সংকলিত হাদিসের আসল কিতাবগুলোকে কেন্দ্র করে হাদিসের নানা ভাষ্যগ্রন্থ রচিত হয় এবং হাদিস শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখার ওপর ব্যাপক গবেষণা অব্যাহত থাকে। বর্তমানকালেও এ কাজ চালু রয়েছে। যোগ্য উলামায়ে কেরামগণ নিষ্ঠার সাথে এ দায়িত্ব পালন করছেন।

​নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে হাদিস আহরিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সহিহ হাদিস লিপিবদ্ধ করা এবং ব্যাপকভাবে চর্চা করা কখনো থেমে থাকেনি।

​তাই সবশেষে আবারও বলব— ‘আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাকালীন হাদিস লিপিবদ্ধ হয়নি; বরং তাঁর পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার শতাব্দীকাল পর লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই রাসুলের মুখনিঃসৃত সহিহ হাদিস এখন খুঁজে পাওয়া দুরূহ’—এ কথা একদম ভিত্তিহীন।

​লেখক: আলেমা, প্রাবন্ধিক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন