বর্তমানে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা বিচলিত। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে যেকোনো মহামারি বা রোগব্যাধির সময় আমাদের যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়, তেমনি বাস্তবমুখী ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেয়। উভয়ের সমন্বয় সাধনই আমাদের ইমানের পূর্ণতা ও সুস্থতার নিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসলাম রোগকে কেবল একটি শারীরিক অবস্থা হিসেবে দেখে না, বরং একে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ও গুনাহ মাফের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার নিরাময় তিনি সৃষ্টি করেননি।” (সহিহ বুখারি-৫৬৭৮)।
ইসলামের দৃষ্টিতে সংক্রমণ ও ভ্রান্তি নিরসন
অনেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি হাদিস- “রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই”- উদ্ধৃত করে দাবি করেন যে, ইসলাম বিজ্ঞানের পরিপন্থী। অথচ এটি অর্ধেক সত্য। পূর্ণাঙ্গ হাদিস ও এর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম বৈজ্ঞানিক কারণকে অস্বীকার করে না, বরং কুসংস্কার নির্মূল করে।
১. ইসলাম কি রোগ সংক্রমণ অস্বীকার করে?
না, ইসলাম প্রাকৃতিক নিয়মে রোগ ছড়ানোকে অস্বীকার করে না। বরং সচেতনতার জন্য আল্লাহর রাসুল (সা.) স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন-
ক. সামাজিক দূরত্ব: “কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো।” (বুখারি: ৫৭০৭)
খ. পশুসম্পদ রক্ষা: “অসুস্থ উটকে যেন সুস্থ উটের সাথে একত্রে রাখা না হয়।” (মুসলিম: ২২২১)
গ. কোয়ারেন্টাইন: প্লেগ বা মহামারি কবলিত এলাকায় প্রবেশ করতে এবং সেখান থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। (বুখারি: ৫৭২৮)
২. হাদিসে কেন বলা হলো “সংক্রমণ নেই”?
এর উত্তর স্বয়ং নবীজি (সা.) দিয়েছেন। যখন এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন যে, একটি চর্মরোগী উট সুস্থ উটের পালে মিশলে সব উট অসুস্থ হয়ে যায়, তখন নবীজি সা. পাল্টা প্রশ্ন করলেন- “তাহলে প্রথম উটটির রোগ সৃষ্টি করল কে?” (আবু দাউদ: ৩৯১১)
ব্যাখ্যা: জাহেলি যুগে আরবরা বিশ্বাস করত রোগ ‘আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়াই’ নিজে নিজে একজনের দেহ থেকে অন্য দেহে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। নবীজি সা. এই অন্ধবিশ্বাস ভেঙে দিলেন। তিনি বোঝালেন- রোগের মূল স্রষ্টা আল্লাহ। জীবাণু কেবল একটি ‘মাধ্যম’ বা ‘কারণ’ মাত্র। আল্লাহ চাইলে মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও রোগ হয় না (যেমন একই ঘরে থেকেও সবাই আক্রান্ত হয় না), আবার আল্লাহ চাইলে মাধ্যম ছাড়াও রোগ হতে পারে (যেমন প্রথম উটটি আক্রান্ত হয়েছিল)।
বিজ্ঞান ও ইসলামের সমন্বয়
আধুনিক বিজ্ঞান বলে, জীবাণু সংক্রমণের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দায়ী। ইসলামও ঠিক তা-ই বলে- সবকিছু আল্লাহর হুকুমে ও তকদিরের অধীনে ঘটে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ‘উপকরণ’ বা সায়েন্টিফিক মেথড ব্যবহার করতে (যেমন টিকা নেওয়া বা দূরত্ব বজায় রাখা), কিন্তু ভরসা রাখতে একমাত্র ‘সৃষ্টিকর্তা’র ওপর।
কুসংস্কার ও সচেতনতা
নবীজি (সা.)-এর যুগে পেঁচা, সফর মাস বা নির্দিষ্ট প্রাণীকে অশুভ মনে করার যে কুসংস্কার ছিল, তিনি সেগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন, রোগ কোনো অভিশাপ বা অশুভ লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি শারীরিক অবস্থা যা যথাযথ চিকিৎসায় সেরে যায়। হাম বা মহামারির সময় শুধু দোয়া করলেই কি হবে?
উত্তর: না। নবীজি সা. কুষ্ঠ রোগীর সাথে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে যেমন আল্লাহর ওপর ভরসা দেখিয়েছেন, তেমনি আবার কুষ্ঠ রোগীকে বায়াত (শপথ) করার সময় তাকে স্পর্শ না করে দূর থেকে ফিরে যেতে বলে সাবধানতাও শিখিয়েছেন।
এছাড়াও আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি চমৎকার হাদিসের আলোকে আমরা জানতে পারি- দুনিয়াতে বিপদ আপদ আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তিনি বেশি দেন। মুসআব ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (সাদ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়?
তিনি বললেন, নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধার্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবেক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহই থাকে না। (তিরমিযি- ২৩৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০২৩)
সুতরাং যেকোনো বিপদকে আমরা ইমান বা বিশ্বাসের সাথে মোকাবিলা করবো, যাতে আমাদের ইমান আরো দ্বিগুণ হয়, মহান রব আমাদের ওপর খুশি হন। আতঙ্ক নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে হবে। ভয় ও আতঙ্ক মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (ওসসঁহরঃু) কমিয়ে দেয়। মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। তবে এই ‘ভরসা’ মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করাই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)। অর্থাৎ, রোগ হলে চিকিৎসা না নেওয়া বা প্রতিষেধক না নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
বাস্তবমুখী ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ
হাম মোকাবিলায় ইসলাম ও বিজ্ঞানের আলোকে আমাদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. টিকা গ্রহণ: হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। শিশুদের এমআর (গজ) টিকা দেওয়া সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’র অংশ। উলামায়ে কেরামের মতে, জীবন রক্ষাকারী যেকোনো হালাল চিকিৎসা বা টিকা গ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ এবং আবশ্যক।
২. পরিচ্ছন্নতা: ইসলামে পবিত্রতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। হামের ভাইরাস থেকে বাঁচতে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা এবং আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত কাপড় পৃথক রাখা জরুরি।
৩. পুষ্টিকর খাবার ও দোয়া: অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মহান আল্লাহর কাছে আরোগ্যের দোয়া করতে হবে। রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন: “হে মানুষের প্রতিপালক! তুমি কষ্ট দূর করো এবং আরোগ্য দান করো, তুমিই আরোগ্য দানকারী।” (বুখারি ও মুসলিম)।
৪. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা: যদি কোনো এলাকায় হাম দেখা দেয়, তবে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা ইসলামের নির্দেশিত ‘সতর্কতা’র শামিল।
হাম নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে শিশুদের টিকা দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করুন এবং সুস্থ সমাজ গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রভাষক (আরবি), মাথাভাঙ্গা মহিলা আলিম মাদরাসা, মুন্সিগঞ্জ।

