আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস
ইসলামে অবহেলিত শিশুর অধিকার ও আমাদের দায়িত্ব
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২০
প্রতি বছর ১২ এপ্রিল পালিত আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস আমাদের সামনে এমন এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা তুলে ধরে, যা মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্ববোধের কঠিন পরীক্ষায় আমাদের দাঁড় করায়। পৃথিবীর অসংখ্য শিশু আজ পরিবার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় জীবনযাপন করছে। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে শুধু ইবাদত নয়, বরং সমাজের দুর্বল ও অবহেলিত মানুষের অধিকার রক্ষার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এতিম, অসহায় ও বঞ্চিত শিশুদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা পথশিশুদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
ইসলামে শিশু ও দুর্বলদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি।” — (সূরা আল-ইসরা: ৭০)। এই আয়াত প্রমাণ করে, প্রতিটি মানুষ—বিশেষত শিশু—জন্মগতভাবে সম্মানিত। পথশিশু হলেও তাদের মানবিক মর্যাদা কখনো খর্ব হয় না। সমাজ বা অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে তাদের অধিকার অস্বীকার করা ইসলাম সমর্থন করে না।
এতিম ও অসহায় শিশুদের অধিকার
পথশিশুদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে এতিম, পরিত্যক্ত বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। কোরআনে এতিমদের প্রতি সদয় আচরণের ব্যাপারে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: “তুমি কি তাকে দেখেছ, যে দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? সে তো সেই ব্যক্তি, যে এতিমকে ধাক্কা দেয়।” — (সূরা আল-মাউন: ১-২)। এখানে এতিমের প্রতি অবহেলাকে ঈমানহীনতার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এতিম ও অসহায় শিশুদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ঈমানের অংশ।
আরও বলা হয়েছে: “তারা তোমাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তাদের কল্যাণ সাধনই উত্তম।” — (সূরা আল-বাকারা: ২২০)। এই আয়াত সমাজের প্রতিটি সদস্যকে এতিমদের উন্নয়ন, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
অসহায়দের খাদ্য ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ
পথশিশুদের অন্যতম প্রধান সংকট হলো খাদ্য ও মৌলিক চাহিদার অভাব। কোরআনে বলা হয়েছে: “তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদের খাদ্য দান করে।” — (সূরা আল-ইনসান: ৮)।
এখানে অভাবগ্রস্তদের খাদ্য প্রদানকে একটি মহৎ ইবাদত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পথশিশুদের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় নিশ্চিত করা তাই শুধু মানবিক কাজ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার
পথশিশু সমস্যার অন্যতম মূল কারণ দারিদ্র্য ও বৈষম্য। ইসলাম অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে: “তোমরা এতিমদের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না, তবে উত্তম উপায়ে ব্যতীত।” — (সূরা আল-আনআম: ১৫২)। এ আয়াত শুধু সম্পদ রক্ষার নির্দেশ দেয় না, বরং এতিমদের প্রতি আর্থিক দায়িত্বশীলতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে পথশিশু সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
রাসূল (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা
আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নিজেই এতিম ছিলেন, তাই তিনি এতিম ও অসহায় শিশুদের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেন: “আমি ও এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকব”—এবং তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল একত্রে দেখালেন। — (সহিহ বুখারি: ৫৩০৪)। এই হাদিসে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আরেকটি হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি কোনো এতিম শিশুর মাথায় স্নেহভরে হাত বুলায়, সে প্রতিটি চুলের বিনিময়ে সওয়াব পাবে।” — (মুসনাদে আহমদ: ২২২৯৩)। এটি দেখায় যে, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানসিক স্নেহ ও ভালোবাসাও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্বল ও বঞ্চিতদের প্রতি দায়িত্ব
নবী (সা.) বলেছেন: “তোমরা দুর্বলদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।” — (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৫৬)।
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করা একটি ঈমানি দায়িত্ব।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস: “সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” — (সহিহ বুখারি: ৬০১৬)। পথশিশুরা আমাদের সমাজেরই অংশ; তাদের ক্ষুধা ও কষ্ট উপেক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
শিক্ষার গুরুত্ব ও শিশুর অধিকার
ইসলাম শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে: “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।” — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)। পথশিশুরা যখন শিক্ষার বাইরে থাকে, তখন তারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা একটি ধর্মীয় দায়িত্বও বটে।
সমন্বিত দায়িত্ব: ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র
কোরআন ও হাদিসের আলোকে পথশিশুদের দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিগত দান-খয়রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সমন্বিত দায়িত্ব।
ব্যক্তিগত দায়িত্ব: প্রতিটি মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করবে—খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্নেহ প্রদান।
সামাজিক দায়িত্ব: সমাজকে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো শিশু রাস্তায় থাকতে বাধ্য না হয়।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পথশিশুদের প্রতি অবহেলার পরিণতি
ইসলামে অবহেলা ও অন্যায়কে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। পথশিশুদের অবহেলা করলে—
অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে।
সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যায়।
এটি শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, বরং একটি নৈতিক ও ধর্মীয় ব্যর্থতা।
সমাধানের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
যাকাত ও সদকার সঠিক ব্যবহার: দরিদ্র ও এতিমদের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা উচিত।
ওয়াকফ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গঠন: দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার জন্য ইসলামি সামাজিক কাঠামো জোরদার করতে হবে।
পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন: শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারকে সহায়তা করা।
শিক্ষা ও নৈতিক উন্নয়ন: ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় নিশ্চিত করা।
মানসিক ও মানবিক সহায়তা: ভালোবাসা, সহানুভূতি ও নিরাপত্তা প্রদান।
পরিশেষে
আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই শিশুরা সমাজের বোঝা নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানের দাবি। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায়। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি—পথশিশুদের অবহেলা নয়, বরং অধিকার নিশ্চিত করব। কারণ, একজন পথশিশুর মুখে হাসি ফোটানো মানেই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও ইসলামী সমাজ গঠনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার
drmazed96@gmail.com

