পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য ও ইসলামের সীমারেখা
হাওলাদার মেহেদী হাচান ইমন
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০১
বাংলা নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ—এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। গ্রামবাংলার কৃষিজীবন থেকে শহুরে নাগরিক সংস্কৃতি—সবখানেই এই দিনটি এক বিশেষ আবেগ তৈরি করে। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে: পহেলা বৈশাখ উদযাপন কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ, নাকি এটি পরিহারযোগ্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবেগ নয়, বরং জ্ঞান, ইতিহাস ও শরিয়তের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।
প্রথমত, পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক ভিত্তি বোঝা জরুরি। ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের খাজনা আদায় সহজ করা, যাতে ফসল কাটার সময় অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা যায়। অর্থাৎ এর সূচনা ছিল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন থেকে, ধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্যে নয়। সময়ের সাথে সাথে এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় আচার নয়, বরং লোকজ ঐতিহ্য প্রাধান্য পেয়েছে।
ইসলাম সংস্কৃতি সম্পর্কে কী বলে? অনেকেই মনে করেন ইসলাম সব ধরনের সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে—“আল-আসলু ফিল আশইয়া আল-ইবাহাহ”—অর্থাৎ, কোনো কিছু মূলত বৈধ, যতক্ষণ না তা নিষিদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই নীতিটি ইসলামি ফিকহের একটি স্বীকৃত মূলনীতি। তাই কোনো সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে সরাসরি হারাম বলতে হলে তার মধ্যে স্পষ্ট শরিয়তবিরোধী উপাদান থাকতে হবে।
তবে ইসলাম কিছু সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। প্রথমত, আকিদা বা বিশ্বাসের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। যদি কোনো উৎসবের সঙ্গে শিরক, কুসংস্কার বা অন্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত থাকে, তাহলে তা মুসলমানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনান আবু দাউদ)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় অনুকরণ বা অন্য ধর্মের আচার অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নৈতিকতার প্রশ্ন। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নামে যদি অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ্যপান বা অনৈতিক আচরণ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্যই নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “মুমিনদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।” (আল-কুরআন, সূরা নূর: ৩০)। অতএব, যে কোনো উৎসবই হোক না কেন, তা যদি ইসলামের নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত, ইসলামে নিজস্ব উৎসবের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত ধর্মীয় উৎসব। নবী (সা.) মদিনায় এসে দুটি উৎসবের পরিবর্তে এই দুই ঈদকে নির্ধারণ করেন (সুনান আবু দাউদ)। সুতরাং, পহেলা বৈশাখকে কখনোই ইসলামি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এখন প্রশ্ন হলো—এই সীমারেখার মধ্যে থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা সম্ভব কি? অনেক সমকালীন আলেমের মতে, যদি এটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে পালিত হয় এবং এর মধ্যে কোনো হারাম বা শরিয়তবিরোধী উপাদান না থাকে, তাহলে তা মুবাহ বা বৈধ হতে পারে। যেমন—পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বৈধ আনন্দ করা, ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়া, বা নতুন বছরের জন্য ইতিবাচক পরিকল্পনা করা—এসবের মধ্যে ইসলামের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘাত নেই।
তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, পহেলা বৈশাখের কিছু আয়োজন—বিশেষ করে শহুরে পরিবেশে—অনেক সময় ইসলামের নৈতিক সীমা অতিক্রম করে। তাই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো অন্ধ অনুকরণ না করে বাছাই করে অংশগ্রহণ করা। সংস্কৃতি পালন করতে গিয়ে নিজের ঈমান ও মূল্যবোধ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
সবশেষে বলা যায়, পহেলা বৈশাখ নিজে কোনো ধর্মীয় সমস্যা নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক দিন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এর সঙ্গে এমন কিছু যুক্ত হয় যা ইসলামের মূলনীতির বিরোধী। তাই দ্বন্দ্ব নয়, বরং সচেতনতা ও সংযমের মাধ্যমে সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে একটি সুন্দর সহাবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন বছর আমাদের জন্য হোক আত্মসমালোচনার, উন্নতির এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি নতুন সুযোগ—এমন দৃষ্টিভঙ্গিই একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: mhasan.fr.du@gmail.com

