Logo

ধর্ম

একদিন পৃথিবী প্রকম্পিত হবে

Icon

মাওলানা সাইফুল ইসলাম সালেহী

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৮

একদিন পৃথিবী প্রকম্পিত হবে

পাহাড়, পর্বত, নদী, সাগর এবং সবুজ গাছপালা দিয়ে সজ্জিত এই সুন্দর পৃথিবী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে- এটাই চূড়ান্ত সত্য। আজ আমরা যেসব দালানকোঠা, রাজপ্রাসাদ, অভিজাত হোটেল এবং আধুনিক নগর সভ্যতা নির্মাণ করে গর্ব করি, সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই একদিন থাকবে না। একটি শহর থাকবে না, একটি দেশ থাকবে না-সবকিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষ পৃথিবীতে চিরস্থায়ীভাবে থাকার স্বপ্ন দেখে, অথচ এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী।

এই মহাবিপর্যয়ের কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “করাঘাতকারী, কী সেই করাঘাতকারী? আর আপনি কীভাবে জানবেন, কী সেই করাঘাতকারী?” (সূরা আল-কারিয়াহ: ১-৩)

সেদিন হঠাৎ এক বিকট শব্দে পৃথিবী কেঁপে উঠবে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করবে। কেউ কাউকে চিনবে না, কেউ কারো খোঁজ নেবে না। ভয় ও বিভীষিকার এমন এক দৃশ্য হবে, যা মানুষের কল্পনারও অতীত। মানুষ সেই ভীতিকর দৃশ্য দেখে বেহুশ হয়ে যাবে।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: “সেদিন মানুষ হবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পতঙ্গের মতো, আর পাহাড়সমূহ হবে ধুনিত পশমের মতো।” (সূরা আল-কারিয়াহ: ৪-৫)

অর্থাৎ, আজ যেসব পাহাড়কে আমরা অটল ও অচল মনে করি, সেদিন সেগুলোও ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে বাতাসে উড়ে যাবে। এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে পুরো পৃথিবী কাঁপতে শুরু করবে। নদী, সাগর, পর্বত- সবকিছু বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। পৃথিবীর বুক ফেটে যাবে, আর এর ভেতরে যা কিছু আছে সব বেরিয়ে আসবে- সোনা, হীরা, মুক্তাসহ সব খনিজ সম্পদ এবং কোটি কোটি বছর ধরে সমাহিত থাকা মৃত মানুষ।

সেদিন মানুষ বিস্ময়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে বলবে, “আজ পৃথিবীর কী হলো?” কিন্তু তখন আর পালানোর কোনো পথ থাকবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে প্রকম্পিত হবে, এবং পৃথিবী তার ভারসমূহ বের করে দেবে, আর মানুষ বলবে- এর কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে।” (সূরা আয-যিলযাল: ১-৪)

এটি হবে এমন এক দিন, যেদিন পৃথিবী নিজেই সাক্ষী হয়ে যাবে মানুষের কাজের ওপর। শুধু তাই নয়, আকাশও সেদিন অক্ষত থাকবে না। সূর্য, চন্দ্র এবং নক্ষত্ররাজি ভেঙে পড়বে।

আল্লাহ বলেন: “যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে, যখন নক্ষত্রসমূহ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, এবং যখন সমুদ্রসমূহ উত্তাল হয়ে উঠবে।” (সূরা আল-ইনফিতার: ১-৩)

সমুদ্রের তলদেশ ফেটে যাবে, আগুন জ্বলে উঠবে, আর পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাবে।

এরপর শুরু হবে মানুষের চূড়ান্ত বিচার। পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি কাজ- ভালো বা মন্দ- সবকিছুর হিসাব নেওয়া হবে। মানুষ যা কিছু করেছে, তা তার সামনে তুলে ধরা হবে। এমনকি মানুষের নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার বিরুদ্ধে বা পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। হাত, পা, চোখ, কান- সবই কথা বলবে আল্লাহর নির্দেশে।

সেদিন মানুষের আমলনামা অনুযায়ী তার নেকি ও বদ আমল ওজন করা হবে। যাদের নেকির পাল্লা ভারী হবে, তারা জান্নাতে চিরশান্তি ও সুখে বসবাস করবে। আর যাদের নেকির পাল্লা হালকা হবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করবে কঠিন শাস্তি।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “যার নেকির পাল্লা ভারী হবে, সে সুখময় জীবনে থাকবে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার স্থান হবে হাবিয়া। আর আপনি কি জানেন, হাবিয়া কী? তা হলো প্রজ্জ্বলিত অগ্নি।” (সূরা আল-কারিয়াহ: ৬-১১)

এই বর্ণনাগুলো আমাদের জন্য শুধু ভয় প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং শিক্ষা ও সতর্কতার জন্য। দুনিয়ার এই জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই আমাদের উচিত এই পৃথিবীতে এমন কাজ করা, যা আমাদের পরকালে মুক্তি ও শান্তির কারণ হবে।

আমরা যেন দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যাই। নামাজ, রোজা, যাকাত এবং সৎকর্মের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করি সেই ভয়াবহ দিনের জন্য। কারণ সেই দিন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না- শুধু নিজের আমলই হবে একমাত্র ভরসা।

সুতরাং, আসুন আমরা সবাই আল্লাহর পথে চলি, নেক আমল করি এবং সেই মহা দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি-যেদিন পুরো পৃথিবী প্রকম্পিত হবে।

লেখক: আলেম ও গবেষক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন