৭. ভোরে কাজ শুরু করা: বরকতময় জীবনের আরেকটি চাবি হলো—ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং কাজ শুরু করা। যে যে পেশায়ই আছি, কারো কাজ শুরু না হলেও অন্তত প্রস্তুতিগুলো ভোরেই সেরে নেওয়া। ফজরের সালাত, ব্যায়াম, তেলাওয়াত, পরিচ্ছন্নতাসহ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী যেকোনো কিছু করা। সকালবেলার গুরুত্ব বোঝাতে মহান আল্লাহ তাআলা সকালের শপথ করে বলেন, ‘উষাকালের শপথ! যখন তা আবির্ভূত হয়।’ (সুরা তাকভির, আয়াত: ১৮)। সকালের কাজ শারীরিক ও মানসিক সুপ্রভাবের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদও আছে:
'রাত কা চালিস
দুপুর কা বালিস,
সুবেহ শাম কা হাওয়া,
হাজার রুপিয়া কা দাওয়া।
শাহ আজমল খান নে কাহা'
রাতে খেয়ে কমপক্ষে চল্লিশ কদম হাঁটা, দুপুরে একটু কায়লুলা বা বিশ্রাম নেওয়া এবং সকালের নির্মল বাতাস হাজার টাকার ওষুধের চেয়েও দামি—চিকিৎসক আজমল খান এমনটিই বলতেন। ভোরের স্নিগ্ধতা, সুন্দর আবহাওয়া ও মনোরম পরিবেশ আসলেই অনেক দামি। না তীব্র গরম, না ঠান্ডা; বরং শান্তিবৃক্ষের শীতল এই ছায়া জান্নাতেও সর্বদা বিরাজমান থাকবে।
নবীজি ও সাহাবায়ে কেরামের আমল ছিল ইশার পরপরই ঘুমিয়ে যাওয়া এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। সকালেই কাজ শুরু করা। ঘুম থেকে উঠে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন। রাসুল (সা.) উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের ভোরবেলাতে তাদেরকে বরকত ও প্রাচুর্য দান করুন।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)।
যখন নবীজি (সা.) কোথাও কোনো ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন তাদেরকে দিনের প্রথম অংশেই পাঠাতেন। বর্ণনাকারী সাখর (রা.) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি কোথাও তাঁর ব্যবসায়ী কাফেলা পাঠানোর ইচ্ছা করলে তাদেরকে দিনের প্রথম অংশেই পাঠাতেন। ফলে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)
শহুরে জীবনে আমরা রাতজাগা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় দেরিতে ঘুমিয়ে সকালের বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। গ্রামেগঞ্জে অবশ্য এখনো সকালে ঘুম থেকে ওঠার সংস্কৃতি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সকালবেলা জীবিকা বণ্টনের সময় বলেও হাদিসে এসেছে।
সুতরাং যে ঘুমিয়ে বা অন্যভাবে সকালের যতটুকু সময় নষ্ট করবে, সে ততটা জীবিকা থেকে বঞ্চিত হবে। সকালে ঘুমানো যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। যারা এই ঘুমকে উপেক্ষা করে কাজে লেগে যেতে পারে, কর্মক্ষেত্রে তারাই এগিয়ে থাকে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর এক ছেলেকে সকালে ঘুমাতে দেখে বলেন, 'ওঠো! তুমি কি এমন সময় ঘুমাবে যখন জীবিকাগুলো বণ্টিত হয়?' (আল-আদাবুশ শরইয়্যা, পৃষ্ঠা ১৪৭)।
সকালের ঘুমের ব্যাপারে সতর্ক করে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, 'তোমরা সকালের ঘুম থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা তা জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় এবং শরীরের সজীবতা নষ্ট করে।' (আন-নিহায়াতু ফি গারিবিল আহাদিস)। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাহাজ্জুদের স্বাদ, তেলাওয়াতের মজা, ভোরের স্নিগ্ধতায় নির্মল বাতাসে শরীরচর্চা ও কাজ শুরু করাসহ বরকতের সব চাবিগুলো অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইমাম ও খতিব, ছোট দেওড়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ, জয়দেবপুর, গাজীপুর সিটি।

