আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে আমাদের চারপাশে আলোর অভাব নেই, তথ্যের প্রাচুর্য আছে আর প্রযুক্তির শিখরে আমরা আসীন। কিন্তু অদ্ভুত এক সত্য হলো—চোখ সচল থাকলেও আমরা যেন ক্রমেই আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই আধুনিক ও চাকচিক্যময় জীবনের পর্দার আড়ালে তৈরি হয়েছে 'অহংকারের বেড়ি ও গাফিলতির অদৃশ্য দেয়াল'।
আমাদের অতি পরিচিত সূরা ইয়াসিনের ৬ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা যেন আজকের এই 'সেলফ-সেন্ট্রিক' বা আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্মের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের ক্যারিয়ারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন ইগো বা অহংকারে রূপ নেয়, তখন তা আমাদের গলার সেই 'অদৃশ্য বেড়ি' হয়ে দাঁড়ায় যা আমাদের সত্যের সামনে মাথা নত করতে দেয় না। আর আমাদের অতিরিক্ত দুনিয়াদারির মোহ তৈরি করে এমন এক 'প্রাচীর', যা আমাদের পরকাল দেখার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়।
আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার—আমরা কি আসলেই মুক্ত? নাকি আমরা আমাদের নিজেদের তৈরি করা এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে আছি? আসুন, সূরা ইয়াসিনের এই অমোঘ আয়না দিয়ে আমাদের হৃদয়ের ভেতরের জগতটাকে একবার পরখ করে দেখি।
ইরশাদ হয়েছে, “যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পিতৃপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি; ফলে তারা গাফেল হয়ে আছে।”
আজকের প্রেক্ষাপট
আমাদের সামনে কুরআন-হাদিস এবং সত্য স্পষ্ট। প্রতিনিয়ত নানাভাবে আমাদের সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও আমাদের দিন শুরু হয় ফোনের নোটিফিকেশন দিয়ে। আর রিলসের স্ক্রলিং-এ আমরা এতটাই মগ্ন যে, আমাদের আশপাশে তাকানোর সুযোগ হয় না। অতি কাছের মানুষের কষ্ট, রাগ-অভিমান এবং অবস্থাও আমাদের স্পর্শ করে না। চোখের সামনে থাকা দুনিয়ার কিংবা আখিরাতের আসল সত্য আমরা ভুলে গেছি। কুরআনের ভাষায় এই সত্য ভুলে যাওয়াকেই চরম 'গাফেল' বা উদাসীন বলা হয়েছে। আর এই 'গাফিলতি' বা উদাসীনতাই আমাদের পতনের প্রথম ধাপ।
ইরশাদ হয়েছে, “তাদের অধিকাংশের ওপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে; ফলে তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না। আমি তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দিয়েছি, যা চিবুক পর্যন্ত ঠেকে আছে, ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে।”
গাফিলতির পরের ধাপ হলো সত্যের বাণী শোনার পর তা অস্বীকার করা। যখন নবীজি (সা.) তাদের কাছে হিদায়াত নিয়ে এলেন, তারা তাদের পূর্বের অভ্যাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করল। এর ফলে তাদের ওপর আল্লাহর আজাবের ফয়সালা অবধারিত হয়ে গেল। আয়াতে 'আগলাল' বা 'বেড়ি' (Shackles) একটি রূপক এবং আধ্যাত্মিক অবস্থা। যারা সত্যের সামনে মাথা নত করে না, তাদের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের গলায় 'অহংকারের বেড়ি' পরিয়ে দেন।
আজকের প্রেক্ষাপট: বর্তমান সময়ে আমরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ওপর এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, ওহীর জ্ঞান বা ধর্মীয় অনুশাসনকে সেকেলে মনে করে অবজ্ঞা করি। আমরা ক্যারিয়ারের দম্ভ, ডিগ্রির অহংকার, জেদ আর ইগোর মধ্যে হাবুডুবু খাই। আমাদের উচ্চশিক্ষা, পদমর্যাদা আর ইগোর 'বেড়ি' আমাদের মাথাকে এতটাই উঁচু করে রেখেছে যে, আমরা সত্যের সামনে বা সিজদায় মাথা নত করতে পারি না।
ইরশাদ হয়েছে, “আর আমি তাদের সামনে এক প্রাচীর এবং পিছনে এক প্রাচীর স্থাপন করেছি। এভাবে আমি তাদের আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।”
মারেফুল কুরআনে বলা হয়েছে, এটি মূলত তাদের কুফর ও জেদের শাস্তি। যখন কোনো মানুষ বারবার সত্যকে দেখেও না দেখার ভান করে, তখন আল্লাহ তার দেখার শক্তি ও উপলব্ধি করার ক্ষমতা কেড়ে নেন। ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে—সামনের দেয়াল হলো আখিরাতকে অস্বীকার করা এবং পিছনের দেয়াল হলো দুনিয়ার মোহে অন্ধ থাকা।
আজকের প্রেক্ষাপট: বর্তমানে আমরা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক মতবাদ, উগ্র আদর্শ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের দেয়ালে নিজেদের বন্দি করে ফেলেছি। আমাদের সামনে সত্যের হাজারো প্রমাণ থাকলেও আমরা আমাদের 'মতাদর্শিক দেয়ালের' বাইরে কিছু দেখতে পাই না। ফলে আমরা সত্যের মাঝখানে থেকেও অন্ধ।
ইরশাদ হয়েছে, “আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন—উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না।”
মারেফুল কুরআনে বলা হয়েছে, দাওয়াত বা তাবলিগ হচ্ছে মুমিনের দায়িত্ব, কিন্তু হিদায়াত আল্লাহর হাতে। যারা নিজেদের অন্তরের দরজা বন্ধ করে দেয়, তাদের ওপর দাওয়াতের কোনো প্রভাব পড়ে না। এদেরকে সতর্ক করা আর না করা সমান। তাদের হৃদয়ের গ্রহণক্ষমতা (Reception) নষ্ট হয়ে গেছে। একজন মৃত মানুষকে ডাকলে যেমন সে সাড়া দেয় না, এই আধ্যাত্মিকভাবে মৃত মানুষগুলোও আর কোনোদিন ঈমান আনবে না।
আজকের প্রেক্ষাপট: বর্তমান সমাজে এমন কিছু মানুষ দেখা যায় যারা অপরাধ, দুর্নীতি বা অনৈতিকতায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাদের বিবেক পুরোপুরি মরে গেছে। আপনি তাদের কুরআনের আয়াত শোনান বা যুক্তিতে বোঝান, তাদের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ বারবার পাপ করতে করতে তাদের হৃদয়ে একটি আস্তরণ পড়ে গেছে, যা কোনো নসিহত গ্রহণ করতে পারে না।
আয়াতের শিক্ষা, আমাদের করণীয় এবং বাঁচার উপায়
মূল শিক্ষা (Core Lessons)
১. গাফিলতিই ধ্বংসের মূল: সত্য আসার আগে মানুষ উদাসীন থাকতে পারে, কিন্তু সত্য জানার পরও যখন মানুষ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, তখন তার অন্তর মৃত হতে শুরু করে।
২. অহংকার মানুষকে সত্য দেখতে বাধা দেয়: গলার 'বেড়ি' মূলত মানুষের ভেতরে থাকা অহংকার বা ইগোর প্রতীক। অহংকারী ব্যক্তি কখনো সত্যের সামনে বিনয়ী হতে পারে না।
৩. আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব: যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার সত্যকে এড়িয়ে চলে, আল্লাহ তাদের চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেন। ফলে তারা চাইলেও আর হেদায়েত পায় না।
আমাদের করণীয় (Action Points)
১. ডিজিটাল গাফিলতি কমানো: প্রতিদিন একটা সময় বরাদ্দ রাখা উচিত যেখানে কোনো ডিভাইস থাকবে না; থাকবে শুধু নিজের এবং আল্লাহর মধ্যকার কথোপকথন (তাফাক্কুর)।
২. বিনয় বা হিউমিলিটি চর্চা করা: আমাদের ক্যারিয়ার বা সামাজিক মর্যাদা যেন ইগো বা 'গলার বেড়ি' না হয়ে দাঁড়ায়। বড়দের সম্মান ও ছোটদের ভালোবাসা ইগো ভাঙতে সাহায্য করে।
৩. কুরআনের সাথে সংযোগ: কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ ও তাফসির বোঝার চেষ্টা করা।
বাঁচার উপায় (Ways to be Cautious)
১. নিজের ভেতরের লক্ষণ চেনা: যখন আপনার সামনে সত্য কথা আসে, তখন যদি মনে বিরক্তি লাগে বা নিজেকে 'আধুনিক' ভেবে সেগুলোকে 'সেকেলে' মনে হয়, তবে বুঝবেন আপনার গলায় 'অহংকারের বেড়ি' তৈরি হচ্ছে।
২. পরিবেশ পরিবর্তন করা: সৎ এবং দ্বীনদার মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা। নেককার বন্ধুরাই আপনার চারপাশের ভুল 'দেয়াল'গুলো ভেঙে দিতে সাহায্য করবে।
৩. গোপন ইবাদত বাড়ানো: মানুষ যখন গোপনে আল্লাহর ইবাদত করে বা দান করে, তখন তার অন্তর থেকে রিয়া (লোকদেখানো ভাব) ও অহংকার দূর হয়।
৪. বেশি বেশি তওবা ও দোয়া করা: আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ইস্তিগফার করা এবং এই দোয়া করা— "হে আল্লাহ! আমাকে সত্যকে সত্য হিসেবে দেখার এবং তা অনুসরণ করার তৌফিক দিন; আর মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চেনার এবং তা থেকে দূরে থাকার শক্তি দিন।"
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন এবং অহংকারের বেড়ি খুলে ফেলে আল্লাহর পথে ফিরে আসার তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, আল ফাতাহ গ্রুপ

