Logo

ধর্ম

মুসলিম সমাজ ও সন্ত্রাস: ভ্রান্ত ধারণার সমাধান

Icon

​আয়াজ আহমদ বাঙালি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪০

মুসলিম সমাজ ও সন্ত্রাস: ভ্রান্ত ধারণার সমাধান

​ধর্ম কখনওই ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক হিংসার হাতিয়ার হতে পারে না। ইসলাম একটি শান্তিপ্রিয় ধর্ম। ইসলাম মানুষকে ন্যায়, সহমর্মিতা, মানবিক মর্যাদা এবং সহনশীলতার শিক্ষা দেয়।

ইসলামের মূল শিক্ষায় রয়েছে সৎ কাজ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সকল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের গুরুত্ব। এই নীতিগুলো মুসলিম ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসৃত হয়েছে এবং মুসলিম সমাজকে শান্তিপ্রিয় ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

​দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ইসলামের নামে সন্ত্রাস চালায়। তাদের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিপরীত।

কোরআনে বলা হয়েছে, “এ কারণেই, আমি বনী ইসরাঈলের ওপর এই হুকুম দিলাম যে, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল—অন্যকে হত্যার অপরাধে কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির অপরাধে ছাড়া—সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল। আর অবশ্যই তাদের নিকট আমার রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছেন। তা সত্ত্বেও এরপর জমিনে তাদের অনেকে অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা মায়েদা: ৩২)।

এই নীতি মুসলিমদের মধ্যে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়। সুতরাং কিছু চরমপন্থী ব্যক্তি সন্ত্রাস চালালেও এটি ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশের পরিচয়ও বহন করে না।

​মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উগ্রপন্থার সঙ্গে জড়িত থাকার ধারণার মূলে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো মিডিয়ার পক্ষপাত। অনেক সময় সংবাদমাধ্যম কিছু চরমপন্থী মুসলিমের কর্মকাণ্ডকে সারাবিশ্বের মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে প্রচার করে—এটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে চরমপন্থীর সংখ্যা নগণ্য। তাদের কর্মকাণ্ডকে সারাবিশ্বের মুসলিমদের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যায়।

​দ্বিতীয় কারণটি হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি। বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় শান্তিপূর্ণ মুসলিম সমাজকে অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হয়।

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে সহিংসতা ও দমনমূলক নীতি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী গঠনে ভূমিকা রেখেছে। এরা ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদের সংখ্যা সামান্য। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা কখনওই নিরীহ মানুষ হত্যা বা আতঙ্ক সৃষ্টিকে সমর্থন করে না।

​মুসলিম সমাজে সহিষ্ণুতা ও শান্তি সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যযুগে আল-আন্দালুসে (বর্তমান স্পেন) মুসলিম শাসনের সময় খ্রিস্টান ও ইহুদিদের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা হয়েছিল; তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম স্বভাবতই শান্তিপ্রিয় এবং মুসলিমরা সহমর্মী ও ন্যায়পরায়ণ।

​অপরদিকে, ISIS, Al-Qaeda ও Boko Haram-এর মতো কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে ইসলামের নাম ব্যবহার করে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালানো এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার মতো কাজ করেছে। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইসলামের শিক্ষার কোনও সম্পর্ক নেই।

কোরআনে উল্লেখ আছে, “ইয়াহূদীরা বলে, আল্লাহর হাত আবদ্ধ, তাদের হাতই আবদ্ধ, তাদের (প্রলাপ) উক্তির কারণে তারা হয়েছে অভিশপ্ত; বরং আল্লাহর উভয় হাত প্রসারিত, যেভাবে ইচ্ছে করেন দান করেন। তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তাদের অনেকের সীমালঙ্ঘন ও কুফরী অবশ্যই বাড়িয়ে দেবে। আর কিয়ামত অবধি আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিয়েছি। যখনই তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন। আর তারা দুনিয়ায় ফাসাদ ছড়িয়ে বেড়ায়; আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা মায়েদা: ৬৪)।

ইসলাম মানুষকে শান্তিপ্রিয় জীবনযাপন, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার শিক্ষা দেয়।

​বিশ্বের যে কোনও সম্প্রদায়েই কিছু চরমপন্থী থাকতে পারে। খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য যে কোনও ধর্মের অনুসারীর মধ্যেও কিছু চরমপন্থী ব্যক্তি থাকতে পারে। মুসলিমদের মধ্যেও কিছু চরমপন্থী থাকতে পারে—এটি সত্য; তবে সেই ভিত্তিতে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কে বিচার বা মূল্যায়ন করা অন্যায়।

মুসলিমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিপ্রিয়ভাবে বসবাস করছেন। শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখছেন। মুসলিমরা শান্তিপ্রিয় এবং সৃষ্টিশীল; তারা সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখেন।

​ভুল ধারণা দূর করতে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষকে শেখাতে হবে যে, ধর্ম হিংসার জন্য দায়ী নয়। ধর্ম হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নির্দেশিকা। ইসলামের মূল শিক্ষা—শান্তি, ন্যায়, মানবাধিকার, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। সন্ত্রাসবাদ হলো চরমপন্থী মানসিকতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ফলাফল।

​সাম্প্রতিককালে মুসলিমরা বিশ্বের নানা দেশে দারিদ্র্য, অসঙ্গতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা করছেন। শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা, মানবাধিকার এবং দারিদ্র্য বিমোচনেও কাজ করছেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা মিডিয়ার পক্ষপাতের কারণে বৃদ্ধি পায়। তুচ্ছ ঘটনার প্রতিফলনকে সারাবিশ্বের মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশই সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত নয়।

ইসলামে মানুষের জীবন পবিত্র এবং সকল মানুষের মর্যাদা সমান। যারা মানুষ হত্যা করে বা নিরীহদের ক্ষতি করে, তারা ইসলামের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ মুসলিমদের আচরণকে প্রতিফলিত করে না।

​গণমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক স্বার্থে কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী ইসলামের নাম ব্যবহার করে। এ ধরনের প্রচারণা মুসলিমদের বিশাল জনসংখ্যাকে অবমূল্যায়ন করে। বাস্তবে মুসলিম সমাজে সহানুভূতি, ন্যায়পরায়ণতা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সর্বদাই বিদ্যমান।

​সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের নগণ্য অংশই ইসলামের নামের সঙ্গে যুক্ত। অতএব, মুসলিমরা সন্ত্রাসী নন। মুসলিমদের মধ্যে চরমপন্থীর সংখ্যা খুবই নগণ্য এবং তাদের কর্মকাণ্ড ধর্মের মূল শিক্ষার বিপরীত। ইসলাম শান্তির শিক্ষা দেয়; মুসলিমরা সাধারণভাবে শান্তিপ্রিয়, ন্যায়পরায়ণ এবং মানবিক। ভুল ধারণা দূর করতে শিক্ষা, মিডিয়ার সচেতনতা এবং সংলাপ অপরিহার্য।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক, আসাম, ভারত।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন