Logo

ধর্ম

আদব সাফল্যের সোপান

Icon

​মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৪

আদব সাফল্যের সোপান

​মানবজীবনের সাফল্য কেবল মেধা, পরিশ্রম বা প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না; বরং এর মূল ভিত্তি হলো আদব, শিষ্টাচার ও চরিত্রের সৌন্দর্য। বিশেষত ছাত্রজীবনে আদব এমন এক মহামূল্যবান গুণ, যা জ্ঞানকে বরকতময় করে, ব্যক্তিত্বকে মহিমান্বিত করে এবং মানুষের জন্য সাফল্যের পথ সুগম করে। তাই মনীষীগণ যথার্থই বলেছেন, ‘যারা সফল হয়েছে, তারা আদবের দ্বারাই সফল হয়েছে; আর যারা অধঃপতিত হয়েছে, তারা বেআদবির কারণেই পতিত হয়েছে।’ এই সংক্ষিপ্ত বাণীর মধ্যে ছাত্রজীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার এক গভীর সত্য নিহিত রয়েছে।

​আদব সাফল্যের চাবিকাঠি: ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ঘটনা

​উক্তির প্রথম অংশ— ‘সফল ব্যক্তিরা আদব অবলম্বনের দ্বারাই সফল হয়েছেন’—এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। নবীজি তাঁকে পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি বিনয়ের সাথে পেছনে সরে গেলেন। যখন রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কেন পেছনে গেলে? তখন তিনি উত্তর দিলেন, 'আপনি আল্লাহর রাসুল, আপনার বরাবর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া কি আমার জন্য শোভনীয়?’ এই উত্তর শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন যেন আল্লাহ তাঁকে দীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। এই আদবের বরকতেই তিনি পরবর্তীতে উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

​বেআদবির ভয়াবহ পরিণতি: ইবলিসের ঘটনা

​উক্তির দ্বিতীয় অংশ— ‘যারা বঞ্চিত হয়েছে, তারা বেআদবির কারণেই বঞ্চিত হয়েছে’—এর সবচেয়ে জ্বলন্ত দলিল হলো ইবলিসের ঘটনা। ইবলিস দীর্ঘকাল ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন ছিল। সে ফেরেশতাদের কাতারেও স্থান পেয়েছিল। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সে অহংকারে অবাধ্য হলো। সে বলল— আমি আগুনের তৈরি, আর আদম মাটির। এই একটিমাত্র বেআদবি—আল্লাহর আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অহংকার—তাকে চিরদিনের জন্য রহমত থেকে বঞ্চিত করল। সে হলো বিতাড়িত, অপমানিত ও অভিশপ্ত। এ থেকে ছাত্রদের জন্য বড় শিক্ষা হলো— অহংকার, অবাধ্যতা ও অশ্রদ্ধা মানুষকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

​ধীর মেধাও আদবের মাধ্যমে সফল হতে পারে

​অনেক ছাত্র মনে করে, মেধা কম হলে সফল হওয়া কঠিন। কিন্তু ইতিহাস আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর বিশিষ্ট শাগরিদ রবী ইবনে সুলায়মান (রহ.) শুরুতে ধীরবোধ্য ছিলেন। একটি মাসআলা বুঝতে তাঁর চল্লিশবার ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছিল। তবুও তিনি লজ্জা, বিনয় ও উস্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাননি। আর ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-ও তাঁর প্রতি অসীম মমতা দেখিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়— মেধার সীমাবদ্ধতা সাফল্যের বাধা নয়; আদব, অধ্যবসায় ও উস্তাদের দোয়া-ই প্রকৃত সাফল্যের মূল।

​উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্কের রহস্য

​জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে উস্তাদ ও ছাত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবী ইবনে সুলায়মান (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! ইমাম শাফেয়ি আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি পানি পান করারও সাহস করতাম না।’ এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ভদ্রতা নয়; বরং অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও মহত্ত্বের প্রকাশ। এই আদবের ফলেই ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁকে এত ভালোবাসতেন যে বলেছিলেন, ‘হে রবী! ইলম যদি খাইয়ে দেওয়া সম্ভব হতো, তবে আমি তোমাকে খাইয়ে দিতাম।’ এখানে স্পষ্ট যে, উস্তাদের মহব্বত জোর করে আদায় করা যায় না; আদব ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়।

​বর্তমান ছাত্রসমাজের জন্য শিক্ষা

​আজকের যুগে জ্ঞান অর্জনের উপকরণ প্রচুর, কিন্তু আদবের চর্চা তুলনামূলক কমে গেছে। অনেক সময় ছাত্ররা শিক্ষকের সামনে উচ্চস্বরে কথা বলে, শিষ্টাচার রক্ষা করে না, বা শিক্ষকের পরামর্শকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে বাহ্যিক জ্ঞান থাকলেও তাতে বরকত থাকে না। প্রত্যেক ছাত্রের উচিত— উস্তাদের সামনে বিনয়ী থাকা, কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখা, সময়ানুবর্তী হওয়া, শিক্ষকের নির্দেশনা মেনে চলা, সহপাঠীদের সম্মান করা এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলা।

​আদবহীন ইলমের পরিণতি

​আদব ছাড়া ইলম অনেক সময় অহংকারের জন্ম দেয়। এমন জ্ঞান মানুষকে আলোকিত না করে বরং অন্ধকারে ঠেলে দেয়। পক্ষান্তরে আদবপূর্ণ ইলম মানুষকে নম্র, বিনয়ী ও কল্যাণমুখী করে তোলে। তাই বলা যায়— ইলম হলো নূর, আর আদব হলো সেই নূর ধারণের পাত্র। পাত্র যদি ভাঙা হয়, তবে নূরও স্থায়ী হয় না।

​প্রকৃত সাফল্য

​ছাত্রজীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; বরং আদব, আখলাক, ইলম ও আমলের সমন্বিত বিকাশ। যে ছাত্র আদবকে আপন করে নেয়, সে উস্তাদের দোয়া লাভ করে, জ্ঞানে বরকত পায় এবং জীবনে সফলতার শিখরে পৌঁছায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের ছাত্রসমাজকে আদব, ইখলাস ও ইলমে নাফে'র তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন