কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তির ব্যবহারে নৈতিকতা
মাওলানা সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৫২
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগ। বলা যায়, আমরা প্রকৃতির ছোঁয়া থেকে বেরিয়ে নতুন কোনো পরিমণ্ডলে বিচরণ করছি। একদিকে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) আমাদের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, এই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈতিকতাহীন মানবজীবনের জন্য ধ্বংস ছাড়া কিছুই নয়।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (Islam is the complete code of life) হিসেবে জীবনের প্রতিটি নতুন অনুষঙ্গে পথপ্রদর্শন করে। প্রযুক্তির এই জোয়ারে একজন মুমিন বা মুসলিমের নৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত, তা কুরআন, সুন্নাহ এবং বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।
১. প্রযুক্তি: আল্লাহর নেয়ামত ও আমানত
ইসলাম মনে করে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কার আল্লাহরই দান। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।” (সূরা আলাক: ৫)
এআই বা আধুনিক প্রযুক্তি মূলত মানুষের মেধা ও শ্রমের ফসল, যা আল্লাহপ্রদত্ত বিচারবুদ্ধির ফল। কেননা মানবসহ সকল সৃষ্টি সেই মহান সৃষ্টিকর্তার। সুতরাং এটি একটি শক্তিশালী নেয়ামত, যা দিয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তবে ইসলামে প্রতিটি নেয়ামতের সঙ্গে ‘আমানতদারির’ প্রশ্ন জড়িত। কিয়ামতের দিন প্রতিটি নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কেবল ভোগের জন্য না হয়ে তাকওয়া ও জনকল্যাণের জন্য হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা একজন বিবেকবান মুমিনের জন্য জরুরি।
২. গুজব ও ভুল তথ্যের ভয়াবহতা (Misinformation)
এআই-এর মাধ্যমে বর্তমানে ডিপফেক (Deepfake) ভিডিও বা ভুয়া অডিও তৈরি করে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো...” (সূরা হুজুরাত: ৬)
মিথ্যা প্রচারের শাস্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়।” (সহিহ মুসলিম)
এআই ব্যবহার করে মিথ্যা সংবাদ বা গুজব ছড়ানো বর্তমান যুগের ‘ফিতনা’র অন্তর্ভুক্ত।
৩. ডিজিটাল যুগে ‘গিবত’ ও প্রাইভেসির অধিকার
AI এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন বা প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা খুব সহজ হয়ে পড়েছে। গোপনে কারো তথ্য সংগ্রহ করা বা কৃত্রিমভাবে কারো ছবি বিকৃত করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না...” (সূরা হুজুরাত: ১২)
গিবত: সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো দোষচর্চা করা বা নেতিবাচক মন্তব্য করা ডিজিটাল গিবতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না...” (সূরা হুজুরাত: ১২)
প্রাইভেসি: AI অ্যালগরিদম অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত রুচি ও তথ্য চুরি করে, আর এটি নিয়ন্ত্রণ হয় মানুষের হাতে। প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এমন সব তথ্য, যা সম্পূর্ণরূপে AI দ্বারা তৈরি মিথ্যা ঘটনা। ইসলাম নির্দেশ দেয় অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “পরস্পরের দোষ অনুসন্ধান করো না।” (সহিহ বুখারি)
৪. AI ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
প্রযুক্তি ও এআই-এর ওপর অতিনির্ভরশীলতা কেবল নৈতিক নয়, শারীরিক ও মানসিকভাবেও ক্ষতিকর। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর নেতিবাচক দিকগুলো হলো:
ক. ডোপামিন লুপ ও আসক্তি: Dr. Anna Lembke তাঁর বিখ্যাত বই Dopamine Nation-এ বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এর সারমর্ম হলো—সোশ্যাল মিডিয়া ও এআইচালিত অ্যাপগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যা মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। এটি মানুষকে সাময়িক আনন্দ দেয়, ফলে মানুষ ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) কমিয়ে দেয়।
খ. কগনিটিভ ডিক্লাইন (প্রজ্ঞা হ্রাস): এআই যদি আমাদের হয়ে সব চিন্তা ও সৃজনশীল কাজ করে দেয়, তবে মানুষের মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়ে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা মানুষের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
গ. মানসিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব: মানুষ সামাজিক জীব। এআই-এর সঙ্গে চ্যাট করা বা ভার্চুয়াল জগতে পড়ে থাকা মানুষকে প্রকৃত সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর ফলে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ (Anxiety) এবং একাকীত্ব বৃদ্ধি পায়।
৫. এআই ও নৈতিক কৃত্রিমতা (Ethical AI)
এআই অনেক সময় মানুষের বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এআই-এর কোনো ‘বিবেক’ বা ‘রুহ’ নেই। এটি প্রোগ্রাম করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চলে। ফলে এআই যদি পক্ষপাতদুষ্ট (Biased) তথ্য দেয় বা অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার দায় ব্যবহারকারীর ওপরই বর্তাবে।
ইসলিামি শরিয়তের মূলনীতি হলো:
“لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ”
অর্থাৎ, কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না; বিনিময়ে অন্যেরও ক্ষতি করা যাবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ২৩৪০, ২৩৪১)
৬. উত্তরণের পথ ও আমাদের করণীয়
প্রযুক্তির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. তাকওয়া জাগ্রত করা: স্ক্রিনের আড়ালে বসে আমি যা করছি, আল্লাহ তা দেখছেন—এই বিশ্বাস দৃঢ় করা।
২. সময় ব্যবস্থাপনা: এআই বা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা। অযথা স্ক্রলিং ইবাদত ও পরিবার থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়।
৩. যাচাই-বাছাই: যেকোনো তথ্য বা এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শেয়ার করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা।
৪. মানবীয় সৃজনশীলতা বজায় রাখা: কেবল এআই-এর ওপর নির্ভর না করে নিজের মেধা ও চিন্তা দিয়ে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
৫. ক্ষতিকর বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা: ক্ষতিকর সব সাইট ব্যবহার পরিহার করা এবং কল্যাণকর বিষয় নিয়ে গবেষণা করা, যা দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর উপকারে আসে।
পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তি নিজে ক্ষতিকর নয়; বরং এর ব্যবহারকারীর নিয়ত ও পদ্ধতি একে ভালো বা মন্দ বানায়। প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের আমলনামা যেন ডিজিটাল গুনাহে ভারী না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। বিজ্ঞান আমাদের প্রযুক্তির গতি দেয়, আর ইসলাম আমাদের দেয় সেই গতি নিয়ন্ত্রণের নৈতিক ব্রেক। প্রযুক্তিকে আমরা জয় করব, কিন্তু প্রযুক্তি যেন আমাদের ঈমান ও মানবতাকে গ্রাস করতে না পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন এবং একে দ্বীন ও মানবতার কল্যাণে ব্যবহারের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রভাষক (আরবি), মাথাভাঙ্গা মহিলা আলিম মাদরাসা, মুন্সিগঞ্জ। saifulru2024@gmail.com

