সংবাদ মাধ্যম বা গণমাধ্যমগুলো হচ্ছে জনসচেতনতা তৈরির অন্যতম এক প্রধান মাধ্যম। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এক একটি সংবাদ বা বক্তব্য তুলে ধরাই মূলত গণমাধ্যমের প্রধান কাজ। সেই সঙ্গে অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করাও কর্তব্য। বরং সত্য ও সঠিক সংবাদ যথাসময়ে প্রকাশ করাই মিডিয়া, গণমাধ্যম বা সংবাদকর্মীদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, এক একটি গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো যেমন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে, তেমনি সামাজিক অন্যায়-অনাচার রোধ এবং আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ বিস্তারেও ভূমিকা পালন করে থাকে।
হ্যাঁ, দৈনিক পত্রিকা ও সাপ্তাহিক, পাক্ষিক জার্নালগুলোও আমাদের সম্মুখে তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ সত্য ঘটনাবলি; প্রকাশ করে সঠিক তথ্য ও তত্ত্ব। যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এক ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে, প্রভাবিত করে জনগণের চিন্তা-চেতনা। সমাজে ছড়িয়ে দেয় শুদ্ধতার বার্তা, সরবরাহ করে গুরুত্বপূর্ণ বহু নিত্যনতুন বিষয়াবলির সঠিক তথ্যও; যেগুলো সমাজ সংস্কারে অসামান্য অবদান রাখে।
এজন্যই গণমাধ্যমগুলোর আবশ্যকীয় এবং নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সততা, আদর্শ, ন্যায়, ইনসাফ ও নিষ্ঠা বজায় রাখা; যে কোনো বিষয়ে পক্ষপাতহীন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা। জনগণের সামনে শুধু নিরপেক্ষ মতামত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই তুলে ধরা। এভাবেই জনগণের কল্যাণে গণমাধ্যমগুলো শতভাগ সঠিক দায়িত্ব ও ভূমিকা রাখতে পারে। নয়তো যা-তা সংবাদ সরবরাহে জনগণের আস্থা-বিশ্বাস হারানো এবং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতাও নষ্ট হতে পারে! এটি ওই গণমাধ্যমের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অতএব, সকল সেক্টরে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের উচিত হবে দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সততা অবলম্বন করা, সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া। হুটহাট একপেশে মন্তব্য ও যাচ্ছেতাই শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। একইভাবে সঠিক শব্দ ও পরিভাষা না জেনে কোনো বিষয় প্রকাশ করাও কখনোই কাম্য নয়।
উদাহরণস্বরূপ, ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শ, মন্তব্য ও পরিভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগেও সচেতনতা অবলম্বন করা জরুরি। এমনকি ছাপার জন্য ইসলাম বিষয়ে একাডেমিক পড়াশোনা আছে এমন লেখক-গবেষকের আর্টিকেলকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। নয়তো হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; যা ইসলাম বিষয়ে কখনো ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নামান্তর হতে পারে, হতে পারে অপব্যাখ্যা কিংবা পরিভাষার অপব্যবহারও।
তাই গণমাধ্যমের উচিত এমন বক্তব্য, বিবৃতি ও প্রতিবেদন থেকে বিরত থাকা যার ফলে ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার পথ উন্মুক্ত হয়। এমন বিতর্কিত তথ্য ও বক্তব্যে সুবিধাভোগীরা স্বার্থ উদ্ধার করেন এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। কখনো ইসলামের সঠিক পরিচয় বিকৃত করা হয়।
আর যদি ইচ্ছাকৃত অপতথ্য ও মিথ্যা প্রচারের জন্য এমন ভুলভাল তথ্য পরিবেশন করা হয়, তবে এটি পরিষ্কার অন্যায়। যা সীমালঙ্ঘন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে নষ্ট করে শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ সামাজিক অবস্থানকে বিনষ্ট করবে। জনগণকে বিভ্রান্ত করে সামাজিক ঐক্য নষ্ট করে এবং কখনো সহজ বিষয়কে জটিল করে তোলে। এভাবে বিভক্তিকেই বরং উসকে দেওয়া হয়। এজন্যই এমন সংবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়!
এজন্য কাউকে কোনোভাবেই প্রতারিত না করা, ধোঁকা দেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং কোনো ধরনের প্রতারণা না করা চাই। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেবে সে আমাদের (মুসলমানদের) দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন করো, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না। মানুষকে সুসংবাদ দাও, (মানুষের মধ্যে অশান্তি ও) বিরক্তি সৃষ্টি করো না।” (সহিহ বুখারি)
সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় আছে, “তোমরা কঠোর হয়ো না, (মানুষকে স্বস্তি) শান্তি দাও। (কারও মধ্যে অশান্তি ও হিংসার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা ও) বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না।” একইভাবে সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও এসেছে, “তোমরা (কারও প্রতি কোনো ধরনের) ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াবে না।” এজন্য যে কোনো সংবাদের ভাষা ও উপস্থাপনা হওয়া দরকার সহজ ও সাবলীল, অপতথ্য ও জটিলতামুক্ত। জনসাধারণের মধ্যে কোনো ধরনের ঘৃণা-বিদ্বেষ, বিরক্তি ও বিভক্তি তৈরি করে—এমন বিভ্রান্তকর সংবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়! বরং বিষয়বস্তুও হওয়া উচিত ইতিবাচক, আশাজাগানিয়া, সুন্দর, শালীন ও সুশৃঙ্খল। কারও সমালোচনা করা হলেও সেটা হোক শালীনতা বজায় রেখে, সঠিক তথ্য-প্রমাণের আলোকে।
যে কোনো সংবাদ গ্রহণের বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! যদি পাপিষ্ঠ কেউ তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখো। নয়তো (এমনও হতে পারে যে) অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো জাতির ক্ষতি করে ফেলবে, অতঃপর তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।” (সূরা হুজুরাত: ০৬)
উপর্যুক্ত আয়াতের তাফসিরে এসেছে—প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রত্যেক (কাজের প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং) শাসকের দায়িত্ব হলো তাদের কাছে যে সংবাদই আসবে—বিশেষ করে চরিত্রহীন, ফাসেক (হিংসুক, চোগলখোর, গিবতকারী) ও ফাসাদ-বিশৃঙ্খলা প্রকৃতির লোকদের পক্ষ হতে—সে ব্যাপারে আগে যাচাই করে দেখা। যাতে ভুল বোঝাবুঝিতে কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
এ আয়াত থেকে এটিও বুঝে আসে যে, যার-তার সংবাদ গ্রহণ করা যাবে না। তাই পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদেরও দায়িত্ব হচ্ছে যে কোনো সংবাদের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা। সংবাদ প্রকাশ করে এমন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও মাধ্যম সম্পর্কে ভালো করে জানা; এরপর তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা। সত্য-মিথ্যা যাচাই করা ছাড়া কারও কোনো সংবাদ বা বক্তব্য গ্রহণ করা উচিত নয়!
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর

