Logo

ধর্ম

শিক্ষক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান

Icon

​মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৯

শিক্ষক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান

​শিক্ষক সমাজ গঠনের কারিগর। জাতির চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি শুধু জ্ঞান প্রদান করেন না; বরং নৈতিকতা, আদর্শ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেন। ইসলাম ধর্মে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, আর শিক্ষকের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। কুরআন ও হাদিসের আলোকে শিক্ষককে শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অভিহিত করা অত্যন্ত যথার্থ।

​ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্ব

​আল্লাহ তাআলা কুরআনের প্রথম ওহিতে বলেন, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ [সুরা আলাক : ১] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামের প্রাথমিক নির্দেশনাই জ্ঞান অর্জনের দিকে আহ্বান। জ্ঞান অর্জন করার জন্য একজন শিক্ষক প্রয়োজন, যিনি মানুষকে সত্যের পথ দেখাবেন।

​রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক

​হজরত মুহাম্মদ সা.-কে আল্লাহ তাআলা ‘মুয়াল্লিম’ বা শিক্ষক রূপে পাঠিয়েছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি উম্মিদের মাঝে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।’ [সুরা জুমুআ : ২] এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, মহানবী সা. কেবল একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; বরং একজন শিক্ষক, যিনি উম্মাহকে শিক্ষা, চরিত্র এবং হিকমতের পথ দেখিয়েছেন।

​হাদিসের আলোকে শিক্ষকের মর্যাদা

​রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু, এমনকি পিঁপড়া নিজের গর্তে এবং মাছ পর্যন্ত, মানুষকে কল্যাণের জ্ঞান প্রদানকারী ব্যক্তির জন্য দোয়া করে।’ [তিরমিজি, হাদিস : ২৬৮৫] এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, শিক্ষকতা এমন একটি মহান পেশা, যার কারণে মানুষ তো বটেই, আল্লাহর সৃষ্ট সব প্রাণীও তাকে শ্রদ্ধা করে।

​শিক্ষক জাতির প্রকৃত রূপকার

​শিক্ষকই জাতিকে গঠন করেন। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের হৃদয়ে জ্ঞান, আদর্শ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম গেঁথে দেন। সমাজে ভালো মানুষ, প্রকৌশলী, ডাক্তার, বিচারক, এমনকি আলেম তৈরির পেছনে এক বা একাধিক শিক্ষকের অবদান থাকে। ইমাম গাযালি রহ. বলেন— ‘শিক্ষক হচ্ছেন নবীদের উত্তরসূরি। তাঁরা যেমন মানুষকে আলোর পথে পরিচালিত করেন, শিক্ষকও তাই করেন।’

​কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক

​কুরআন ও হাদিসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক গুরু-শিষ্য না হয়ে যেন পিতা-পুত্র, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সম্মাননীয় হয়, সে নির্দেশনা রয়েছে। হজরত আলী রা. বলেন— ‘যে আমাকে একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছে, আমি তার গোলাম হয়ে গেলাম।’ এই উক্তি শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার পরিচায়ক।

​নারী শিক্ষক এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

​ইসলামে নারী শিক্ষকেরও বিশেষ গুরুত্ব আছে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর স্ত্রী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. ছিলেন একজন বড় মুফাসসির ও মুহাদ্দিসা। হাজার হাজার সাহাবি তাঁর থেকে হাদিস ও ইসলামি জ্ঞান শিখেছেন। নারী শিক্ষকদেরও জাতি গঠনে ভূমিকা অপরিসীম।

​আধুনিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের ভূমিকা

​আজকের সমাজে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে শিক্ষকতার ধরন পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষকের গুরুত্ব একবিন্দুও কমেনি। এখনো শিক্ষকরা ছাত্রদের মেধা, মননশীলতা ও চারিত্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। একজন আদর্শ শিক্ষককে হতে হবে—

​সত্যবাদী ও ন্যায়নিষ্ঠ।

​ছাত্রদের প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল।

​ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা।

​সমাজের আদর্শ।

​ইসলামি সমাজে শিক্ষককে কীভাবে সম্মান দেওয়া উচিত

​১. তাঁর সাথে নম্রভাবে কথা বলা।

২. শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

৩. তাঁর অনুমতি ব্যতীত কথা না কাটা।

৪. তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করা।

৫. তাঁর জন্য দোয়া করা।

​আল্লাহ বলেন, ‘বলুন— হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।’ [সুরা ত্বা-হা : ১১৪] এই দোয়া শুধু ছাত্রদের নয়, শিক্ষকদেরও উচিত; কারণ একজন শিক্ষক যত বেশি শিখবেন, তত বেশি সঠিকভাবে শেখাতে পারবেন।

​শিক্ষকতা মহান দায়িত্ব

​শিক্ষকতা নিছক একটি পেশার নাম নয়, এটি এক মহান দায়িত্ব। ইসলাম শিক্ষককে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে, কারণ তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের উম্মাহ। শিক্ষকরা জাতির স্থপতি, মানবতার গাইড এবং আলোর বাহক। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না; বরং মানবতার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। আসুন আমরা শিক্ষকদের যথাযোগ্য সম্মান দেই, তাঁদের দোয়া ও পরামর্শকে মূল্য দিই এবং নিজেরাও নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত হই।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন