এক.
যাত্রাবাড়ী থেকে বাংলাবাজার যাচ্ছি—প্রায় ৪-৫ বছর আগের কথা। একটা মিনিবাসে উঠলাম। আমার সামনে এক লোক বসেছিলেন। পাশের সিটে বসেছিলেন এক উকিল।
তারা দুজনে কথা বলছিলেন। সামনের লোকটা ছিল ডিপ্রেসড টাইপের—সব বিষয় নিয়েই তার হতাশা। সে হতাশা ঝাড়তে ঝাড়তে একসময় বলল:
"স্কুলে বসে আমরা গরুর রচনা মুখস্থ করেছিলাম। কিন্তু সেই রচনা কি আমাদের জীবনে কোনো কাজে লাগছে? এতদিন ধরে কাজ করছি—কই, কেউ তো আমাকে গরুর রচনা মুখস্থ বলতে বলেনি!"
ঠিক এমন কথাই বলে কওমি পড়ুয়া কিছু বেক্কেল। তারাও বলে, "কওমিতে আমি যা যা পড়েছি, তার কোনো কিছুই আমার কাজে আসেনি। এই যে নাহু-সরফ মুখস্থ করেছি—তা কী কাজে এসেছে? এই যে তারকিব করেছি—তা কী কাজে এসেছে?"
আবারও বলছি, এরা হলো বেক্কেল। এই বেক্কেল কেবল কওমিতেই নেই; এরা আছে জেনারেলেও।
দুই.
বাসের ওই উকিল সাহেব পাশের লোকের কথার কোনো জবাব দেননি। তবে এই কথার জবাব পেয়েছি রকমারির সোহাগ ভাইয়ের একটি ভিডিও ক্লাসের ছোট্ট ক্লিপে।
আমাদের ব্রেইনের দুটি অংশ। একটি অংশ ক্রিটিক্যাল চিন্তা করে, আরেকটি অংশ দ্রুত চিন্তা করে। এই দুটি অংশই দরকার।
আমরা যখন অঙ্ক করি বা তারকিব করি, তখন আমাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং শক্তিশালী হয়। আর যখন আমরা মুখস্থ করি—হোক সেটি গরুর রচনা বা সরফের বহছ—তখন আমাদের ব্রেইনের দ্বিতীয় অংশটি মজবুত হয়।
ব্রেইনের এই প্র্যাক্টিসের মাধ্যমেই একজন মানুষ চিন্তাশীল হয়ে ওঠে। অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের সাথে কথা বলে দেখুন—তাদের অধিকাংশেরই চিন্তাশক্তি দুর্বল। তারা খাওয়া-পরার বাইরে তেমন যৌক্তিক চিন্তা করতে পারে না।
তিন.
শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য কখনোই সরাসরি কর্মমুখী জনগণ তৈরি করা নয়; বরং জনগণকে আদর্শবান ও চিন্তাশীল করে গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
যদি শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হয় সরাসরি কর্মমুখী মানুষ তৈরি করা, তবে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি—যেগুলো সরাসরি কোনো পেশা তৈরি করে না—সেগুলো কি অর্থহীন?
স্রেফ দু-একটি বিষয় আছে, যেগুলো সরাসরি কর্ম তৈরি করে। বাকি অধিকাংশ বিষয়ই সরাসরি কোনো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে না। সুতরাং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই স্রেফ কর্মমুখী করে তোলার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।
চার.
কওমি সিলেবাস সংস্কারের নামে এর মাঝে প্রচুর বাংলা-ইংরেজি ঢোকানোর কথা বলা হয়। এটি আসলেই কোনো কাজের কথা নয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে—আলেম তৈরি করা।
কেউ কেউ বলে, "কওমি সিলেবাসে যদি বাংলা-ইংরেজি থাকত, তবে কেউ চাইলে পরবর্তীতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত।"
চিন্তাটাই ভুল; যেন বাংলা-ইংরেজি পড়া থাকলেই সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যেত!
উল্টো দিকে তাকান— স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সার্টিফিকেটধারী ২৬ লাখ মানুষ বেকার। সরকারি হিসাবের বাইরেও আরও কত মানুষ বেকার, তার সঠিক হিসাব আছে কারও কাছে?
কওমিতে শুরু থেকেই হাফেজ, আলেম ও মুফতি তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে পড়ানো হয়। এখন কীভাবে যুগোপযোগী আলেম তৈরি করা যায়—সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যারা দাওরার পর ইলমি লাইনে আরও এগিয়ে যেতে চায়, তারা কীভাবে এগোবে—সেটি নিয়েও কথা হতে পারে।
কিন্তু সবাই মুহাক্কিক আলেম হবে না। ভূরি ভূরি মুহাক্কিক আলেম তৈরি করাও সম্ভব নয়। মুহাক্কিক আলেম হবেন হাতেগোনা কয়েকজন; বাকিরা চলে যাবেন কর্মের বিভিন্ন ময়দানে—এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা কীভাবে সহজ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এছাড়া কওমি সিলেবাসে যা যা পড়ানো হয়, তা যেমন আদর্শ গঠনে সহায়ক, তেমনি মেধা বিকাশেও অত্যন্ত কার্যকর।
পাঁচ.
গ্যাপটা কোথায়? একটা বড় গ্যাপ হলো—কওমিতে দাওরার আগে কোনো স্টপেজ নেই। হয় দাওরা, নয়তো কিছুই নয়। সাধারণ শিক্ষায় যেমন মেট্রিক পাসও একটা স্বীকৃতি; কিন্তু কওমিতে ‘মাস্টার্স পাস’ (দাওরা) ছাড়া কোনো গতি নেই।
আর আসল গ্যাপটা হলো কওমি সনদের স্বীকৃতিতে। কওমির সার্টিফিকেট দিয়ে সাধারণত জব সেক্টরে আবেদন করা যায় না। শুধু সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেই জব সেক্টরে কওমিদের সুযোগ অনেক বেড়ে যেত।
দর্শনে মাস্টার্স করা লোক কি সবসময় দর্শন নিয়েই কাজ করে? কেউ ইংরেজি সাহিত্য পড়েও কাজ করে একাউন্টেন্ট হিসেবে। এমন অনেক বিষয়ই আছে, যেগুলো সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করে না; কিন্তু সনদের স্বীকৃতি থাকায় তারা ঠিকই জব মার্কেটে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে।
কওমি সনদের সঠিক মূল্যায়ন থাকলে আমরাও নিজেদের জব মার্কেটে উপস্থাপন করতে পারতাম। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে এমন অনেক কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতার প্রয়োজন বেশি; সেই সাথে স্কিল শেখারও বিভিন্ন মাধ্যম এখন আমাদের হাতের নাগালে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক, লেখক

