Logo

ধর্ম

আলেম সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা

Icon

​যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩০

আলেম সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা

​আলেম-ওলামা হলেন পৃথিবীর মহামূল্যবান সম্পদ। তাঁদের উসিলায় পৃথিবীবাসীর অগাধ কল্যাণ সাধিত হয়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রকৃত আলেমের মর্যাদা অনেক বেশি। আল্লাহ তায়ালা আলেমগণকে আপন একত্ববাদের অন্যতম সাক্ষী বানিয়েছেন। একজন আলেমের জন্য এর চেয়ে মহা সম্মানের বিষয় আর কী হতে পারে! পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই এবং ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত আলেমগণও (সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,) তিনি ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী।” (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৮)

​অপর এক আয়াতে এসেছে, “অতএব আলেম-জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।” (সুরা: নাহল, আয়াত: ৪৩) এ আয়াতে মহান আল্লাহ যেকোনো শরয়ি সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণ লোকদের নির্দেশ দিয়েছেন আলেমদের দ্বারস্থ হওয়ার। সুতরাং ইমান, আকিদা ও আমল সঠিক রাখার জন্য প্রত্যেক মুসলিমের উচিত কোনো আলেমের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করা। আলেম ব্যতীত অন্য কারো থেকে ইসলামি জ্ঞান অর্জন করলে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

​আলেমগণ হলেন নবীগণের ওয়ারিশ। হজরত আবুদ্দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আলেমগণ হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী (ওয়ারিশ)। নবীগণ দিনার বা দিরহামকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যান না। বরং, তাঁরা রেখে গেছেন শুধু ইলম। সুতরাং যে লোক তা গ্রহণ করেছে, সে পূর্ণ অংশ গ্রহণ করেছে।” (সহিহ আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৫৭)

​আলেমদের অগাধ মর্যাদা প্রসঙ্গে হাদিসে আরও এসেছে, আবু উমামা আল-বাহিলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দুজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হলো, যাদের একজন আলেম অপরজন আবেদ (অর্থাৎ, যিনি আলেম নন তবে ইবাদতকারী)। তখন তিনি বলেন, “আলেমের মর্যাদা আবেদের ওপর, যেমন আমার মর্যাদা তোমাদের সাধারণের উপর।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “নিশ্চয়ই তাঁর (আলেমের) প্রতি আল্লাহ রহমত করেন এবং আল্লাহর ফেরেশতামণ্ডলী, আসমান-জমিনের অধিবাসী, পিপীলিকা তার গর্তে থেকে এবং এমনকি মাছও কল্যাণের শিক্ষা দানকারী (আলেম) ব্যক্তির জন্য দোয়া করেন।” (সহিহ তিরমিজি, হাদিস: ২৬৮৫)

​আলেম সমাজের অধিকার রক্ষার বিষয়ে হাদিসে জোর দেওয়া হয়েছে। হজরত উবাদা ইবনে ছামিত রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সেই লোক আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের বড়দেরকে সম্মান করে না, ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আলেমদের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না।” (আহমদ, হাদিস: ২২৭৫৫; সহিহুত তারগিব, হাদিস: ৯৫)

​শুধু আলেম সমাজই একদম সঠিকভাবে কুরআন অনুধাবন করতে সক্ষম। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “(হে নবী,) মহান আল্লাহ এমন সত্তা, যিনি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তাতে কিছু আয়াত আছে মুহকাম (মৌলিক সুস্পষ্ট অর্থবোধক), এগুলো হচ্ছে কিতাবের মূল। আর অন্যগুলো মুতাশাবিহ (সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়)। অতএব যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা ফেতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট) আয়াতগুলোর অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ ব্যতীত কেউ এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে অবগত নয়। আর যারা (ইসলামি) জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত তারা বলে, ‘আমরা এগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। সবকিছুই আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে।’ মূলত আলেমগণ ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৭)

​আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোনো জেনারেল শিক্ষিত লোকের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করে অথবা নিজেই কুরআন-হাদিস সম্পর্কিত কিতাবাদি পড়ে আলেম সমাজের ভুল ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ একজন আলেমের ভুল ধরার যোগ্যতা শুধু আরেকজন আলেমেরই আছে। শরিয়ত সম্পর্কে পূর্ণ অভিজ্ঞ যোগ্য উস্তাদ ব্যতীত নিজে নিজে কুরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জন করে কেউ আলেম হতে পারে না। আর যারা শরিয়তের সঠিক জ্ঞানের ধারক-বাহক নয়, তাদের কাছ থেকে কুরআন-হাদিসের জ্ঞান নিলে গোমরাহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই এ ধরনের লোক থেকে দূরে থাকা উচিত। তাদের দেওয়া কোনো মাসআলা-মাসায়েল গ্রহণ করা জায়েজ নেই। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আলেম ও মুফতিগণের শরণাপন্ন হতে হবে।

​আলেম সমাজের মর্যাদা যে অনেক বেশি, তা কুরআন-হাদিসের অকাট্য দলিল-প্রমাণাদি দ্বারা সাব্যস্ত হলো। ইসলামের প্রকৃত অনুসারী তাঁরাই। তাঁদের হৃদয় কুরআন-হাদিসের আলোয় আলোকিত। অসংখ্য মানুষ তাঁদের ইলম দ্বারা উপকৃত। বাতিলের সামনে তাঁরা কভু মাথা নত করেন না। তবে যেহেতু তাঁরা নবী-রাসুল নন, তাই তাঁদের দ্বারা কিছু গুনাহ হয়ে যেতে পারে। কিছু ভুল তাঁরা করে ফেলতে পারেন। তাই বলে আলেম সমাজের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ বাক্য ছুঁড়ে দেওয়া উচিত নয়। যারা আলেম নয় তাদের দ্বারা কি কখনও কোনো পাপ সংঘটিত হয় না? নিশ্চয়তার সাথে যে কেউ এর জবাবে বলবে, অবশ্যই হয়। এমনকি আলেমদের তুলনায় তাদের পাপ আরো বেশি হয়। এর কারণ হলো দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও আল্লাহভীতির অভাব। প্রকৃত আলেম সমাজ দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের ধারক-বাহক হওয়ার পাশাপাশি অধিক আল্লাহভীরু হয়ে থাকেন। তাই তাঁদের দ্বারা অনেক কম গুনাহ সংঘটিত হয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহর বান্দাদের মাঝে শুধু আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে।” (সুরা: ফাতির, আয়াত: ২৮)

​আমরা সবাই খুব ভালোভাবে অবগত আছি যে, মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদত ও তাঁর হক আদায় করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের তুলনায় আলেম সমাজ অনেক বেশি অগ্রগামী। এমনকি সঠিক ইলমের অধিকারী হওয়ায় এবং শরিয়তের মাসআলাসমূহ সুন্দরভাবে আত্মস্থ থাকায় তাঁদের ইবাদত হয় সহিহ। এবার আসা যাক বান্দার হকের ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে। একজন আল্লাহভীরু আলেম কখনও কোনো মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে খান না; সুদ-ঘুষের টাকা দিয়ে পেট ভর্তি করেন না; দুর্নীতি করেন না; মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন না। আজ পর্যন্ত সমাজে কখনও আলেম সন্ত্রাসী পাওয়া যায়নি; আলেম হাইজ্যাককার ধরা পড়েনি। চুরি-ডাকাতি, বাটপারি—এগুলো ছাড়াও সমাজে যে আরও কত অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, এগুলোর সাথে কোনো নিষ্ঠাবান আলেম জড়িত নন।

​পুণ্যবান বলা হয় তাকেই, যার অগণিত গুণ দ্বারা কিছু দোষ ঢেকে যায়। তাকেই আমরা ভালো মানুষ হিসেবে চিনি। আর খারাপ-বদকার বলা হয় তাকে, যার অগণিত দোষ দ্বারা কিছু গুণ ঢেকে যায়। সেই হিসেবে আলেম সমাজ সত্যিকার অর্থে পুণ্যবান মানুষ। কারণ, তাঁদের দোষ কম, গুণ বেশি। আমরা জানি, পুণ্যবান মানুষরাই দেশের সম্পদ, দেশের শ্রেষ্ঠ নাগরিক। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

​আলেম বিদ্বেষের পরিণতি: আলেমগণ হলেন মহান আল্লাহর অলি। তাঁদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা আল্লাহর সঙ্গে লড়াই করার নামান্তর। সুতরাং যে ব্যক্তি আলেমের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করে, সে যেন স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হজরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো অলির (আলেমের) সঙ্গে দুশমনি করল, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)

​শাইখ জাদাহ আল্লামা আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ কালয়ুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যদি কেউ ইসলামি শরিয়ত অথবা শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো মাসআলা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তবে সে কুফরি কাজ করল। যদি কেউ কোনো আলেমের সাথে ব্যক্তিগত কোনো কারণ ব্যতীত (আলেম হওয়ার কারণে) শত্রুতা পোষণ করে, তবে তার কাফের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি কেউ কোনো ফকিহ আলেমকে বা হজরত আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বংশধরকে গালি দেয়, তাহলে (একদল ফুকাহায়ে কেরামের মতে) সে কাফের হয়ে যাবে। (মাজমাউল আনহুর: ১/৬৯৫, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/২৭০, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৫/৫০৮)

​ইমাম হাফেজ আবুল কাসেম ইবনে আসাকির রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হে ভ্রাতা, জেনে রাখো, উলামায়ে কেরামের দোষ চর্চা করা বিষাক্ত জিনিস। মহান আল্লাহ পাকের অভ্যাস হলো, উলামায়ে কেরামের কুৎসা রটনাকারীকে তিনি লজ্জিত করেন (এটি পরীক্ষিত)। যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের সমালোচনা করবে, মহান আল্লাহ তার মৃত্যুর পূর্বে তার অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেবেন।” আলেমের সঙ্গে দুশমনি এবং তাঁকে গালি দেওয়ার কারণ দুটি হতে পারে। যথা: ১. ব্যক্তিগত কোনো কারণে ২. আলেম হওয়ার কারণে। কোনো আলেমকে আলেম হওয়ার কারণে গালি দেওয়া বা তাঁর সঙ্গে বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা কুফরি কাজ। এটি অনেক ভয়ংকর মানসিকতা। এমন মানসিকতা লালনকারী লোক তওবা না করলে ইমানের সাথে তার মৃত্যু হবে কি না—এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে।

​মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং ভয়ংকর এই পাপ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন