Logo

ধর্ম

বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অবমাননা

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১৪:০৫

বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অবমাননা

একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।” এই কঠিন হওয়ার মূল কারণ হলো, স্বাধীনতা অর্জনের সময় শত্রু থাকে দৃশ্যমান এবং লক্ষ্য থাকে সুনির্দিষ্ট। কিন্তু অর্জনের পর শুরু হয় বহুমুখী সংগ্রাম। বিশেষ করে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেক বেশি জটিল। আমরা আমাদের সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই, আমরা বাহ্যিক স্বাধীনতা পেলেও ভেতর থেকে আদর্শিক দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এই অবক্ষয় আমাদের বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানছে। সে হিসেবে বলা যায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা সহজ কিন্তু সেটা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন।

বিশ্বাস ও জ্ঞানের গুরুত্ব

যেকোনো আদর্শ বা ধর্মে দীক্ষিত হওয়া যতখানি সহজ; তার মর্মার্থ, পবিত্রতা রক্ষা, আদর্শ, লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়মকানুন শতভাগ পালন করা ততখানিই কঠিন। ইসলাম কেবল কিছু উৎসব বা অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদর্শিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করে তার সন্তুষ্টি অর্জন এবং দুনিয়াবাসীর কল্যাণ সাধনই ইসলামের মূল লক্ষ্য। আর এই বিধানের মূল ভিত্তি হলো ঈমান বা বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান। ঈমান বিষয়ে পরিপূর্ণ সঠিক জ্ঞান থাকলে কেউই সহজে পথভ্রষ্ট হবে না। এ কারণেই পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল জ্ঞান অন্বেষণ করার বিষয়ে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা আল-আলাক: ১) যথাযথ জ্ঞান না থাকলে সামান্য প্ররোচনায় বা অপপ্রচারে মানুষ তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারে, যা ব্যক্তিকে যেমন পথভ্রষ্ট করে, সমাজকেও অস্থিতিশীল করে তোলে।

ইসলাম নিয়ে কটূক্তি: আদর্শিক বিচ্যুতি

ইসলামের পরিভাষায় মুরতাদ বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যে সজ্ঞানে ইসলাম গ্রহণ করার পর তা পরিত্যাগ করে এবং ইসলামের মৌলিক বিধান বা পবিত্র বিষয়াবলি নিয়ে কটূক্তি ও বিদ্রূপ করে। সভ্য সমাজে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিশ্বাসের অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকার যখন অন্য কোটি কোটি মানুষের প্রাণের বিশ্বাসকে আঘাত করার হাতিয়ার হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত থাকে না। যখন কেউ নিজের শেকড় বা বিশ্বাসকে উপহাস করে, তখন তা সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও পারস্পরিক বিদ্বেষের বীজ বপন করে। বিশ্বাসের এই বিচ্যুতি কেবল ব্যক্তির ক্ষতি নয়, বরং সামাজিক সংহতির জন্য একটি বড় হুমকি।

বাকস্বাধীনতার নামে চরম স্বেচ্ছাচারিতা

বর্তমান সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, একদল মানুষ ‘বাকস্বাধীনতা’ বা ’মতপ্রকাশের স্বাধীনতার’ দোহাই দিয়ে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে। তারা এই মহান শব্দটিকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কুৎসিত আক্রমণ চালাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে। অথচ প্রকৃত বাকস্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আপনি কারো পবিত্র বিশ্বাসকে নোংরাভাবে বিদ্রূপ করবেন। স্বাধীনতার সাথে সবসময় দায়বদ্ধতা মিশে থাকে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অন্য ধর্মের উপাস্যদের নিয়েও গালি দিতে নিষেধ করেছেন: “(ওহে মুমিনগণ!) আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তারা ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, কেননা তারা তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকে গালি দেবে। আর এভাবেই আমি প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের কার্যকলাপকে তাদের দৃষ্টিতে চাকচিক্যময় করে দিয়েছি, অতঃপর তাদের প্রত্যাবর্তন (ঘটবে) তাদের প্রতিপালকের নিকট, তখন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা কিছু তারা করতো।” (সুরা আল-আনআম: ১০৮)। ইসলাম যেখানে অন্যের বিশ্বাসের প্রতিও ন্যূনতম শিষ্টাচার শেখায়, সেখানে স্বাধীনতার নামে নিজের ধর্মের বা অন্য ধর্মের অবমাননা করা কোনোভাবেই অধিকার হতে পারে না; বরং এটি চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও অপরাধ।

সুস্থ সমালোচনা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কটূক্তি

জ্ঞানের চর্চা বা যুক্তিনির্ভর আলোচনার পথ ইসলামে সবসময় উন্মুক্ত। কিন্তু সুস্থ সমালোচনা আর কুরুচিপূর্ণ কটূক্তি এক জিনিস নয়। সত্যের পথের পথিক যারা তারা কখনোই গালাগালি বা অপমানের পথ বেছে নেয় না। যারা সুকৌশলে ধর্মের অবমাননা করে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়, তারা মূলত বাকস্বাধীনতার অপব্যবহারকারী। তারা যুক্তি দিয়ে নয়, বরং ঘৃণা ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চায়। একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এই মানসিকতা আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত। কারণ এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজের পারস্পরিক সহাবস্থান ও শ্রদ্ধাবোধকে নষ্ট করে দেয়। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের বিগর্হিত কাজ করে তারা মূলত অসুস্থ মানসিকতার। যেমন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারীমের সুরা তাওবার ৬৫-৬৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা জোর দিয়েই বলবে, ‘আমরা হাস্যরস আর খেল-তামাশা করছিলাম।’ বলো, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে?”

আদর্শিক প্রতিবাদ ও বিচারিক প্রক্রিয়া

যেকোনো অপরাধ বা আদর্শিক বিচ্যুতির প্রতিকার হওয়া উচিত প্রচলিত আইন ও সঠিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই ইসলাম বা সভ্য সমাজ সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের সর্বদা সংযম ও শান্তির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মানুষরা নিরাপদ থাকে।” (সহীহ বুখারী)। তাই আমাদের প্রতিবাদ হতে হবে আদর্শিক, শান্তিপূর্ণ এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে। আবেগ বা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ন্যায়ের দাবির মাধ্যমেই সমাজকে সুন্দর ও নিরাপদ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “বস্তুত ফিতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর।” কোনোভাবেই আইনকে হাতে তুলে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মব তৈরি করা আমাদের উচিত হবে না। মববাজি থেকে আমাদেরকে সর্বদা বিরত থাকতে হবে।

প্রশাসনের নিকট আবেদন

পরিশেষে, আমি দেশের প্রশাসন ও সচেতন মহলের নিকট বিনীত আবেদন জানাচ্ছি- যারা বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রচলিত কঠোর আইনের আওতায় আনা হোক। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন কাউকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না দেয়। আমাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন এবং সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তি বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক; সালনা, গাজীপুর। 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন