জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন:
আত্মশুদ্ধির বসন্তকাল
মুফতি কামরুল বিন আইয়ুব
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১৩:৫৫
দিনযাপনের চেনা ছক পেরিয়ে বছর ঘুরে আমাদের মাঝে যখন জিলহজ মাস ফিরে আসে, তখন চারপাশের বাতাসে এক উৎসবের আমেজ খেলা করে। আমাদের নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনে জিলহজ মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পশুর হাটের কোলাহল, দড়ি-খড়ের চেনা গন্ধ আর কোন হাটে কত বড় পশু উঠল তা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলা আড্ডা। প্রযুক্তির এই যুগে এর সাথে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পশুর ছবি বা দাম নিয়ে আভিজাত্য প্রকাশের অলিখিত এক দেখনদারি প্রতিযোগিতা। কিন্তু একটু নিবিড়ভাবে ভাবলে মন সায় দেয়—জিলহজ মাস কি কেবলই পশুর হাটের এই বাহ্যিক শোরগোল আর ঈদের দিনের মাংসের স্বাদ নেওয়ার আয়োজন? উৎসবের এই চকমকে আলোর নিচে আমাদের অবহেলায় কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে এই মাসের প্রথম দশটি দিনের মূল আধ্যাত্মিক ও মানবিক দর্শন।
আজকের যান্ত্রিক ও চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে আমরা যখন কেবল কেনাকাটা আর লৌকিক আনুষ্ঠানিকতায় মগ্ন, তখন ইসলাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় বছরের এই ১০টি দিন আসলে স্রষ্টার নৈকট্য ও নিজের মনকে পরিচ্ছন্ন করার এক পরম সুযোগ। এটিকে আমরা বলতে পারি মুমিনের জীবনের এক আত্মিক বসন্তকাল। মহান আল্লাহ তাআলা এই দিনগুলোর গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কুরআনের সূরা ফজরের শুরুতে ভোরের পাশাপাশি এই দশটি রাতের শপথ করেছেন।
আল্লাহর কাছে কোনো সময়ের কসম খাওয়ার অর্থই হলো, মানুষের জীবনে সেই সময়ের মূল্য অনেক বেশি। একইভাবে সূরা হজের আয়াতেও এই নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর নাম স্মরণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
কুরআনের আয়াত: আল্লাহ তাআলা বলেন, "...এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।" (সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৮) (হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর মতে, 'নির্দিষ্ট দিনগুলো' হলো জিলহজের প্রথম দশ দিন।)
আমরা প্রতিদিন কত সাধারণ কাজেই না সময় নষ্ট করি, অথচ আমাদের নবী (সা.)-এর বাণী থেকে জানা যায়—এই ১০টি দিনে করা ছোট একটি ভালো কাজও আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে, এমনকি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।
হাদিসের রেফারেন্স: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "এই (জিলহজের প্রথম) দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট আর কোনো দিনের আমলই বেশি প্রিয় নয়।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তিনি বললেন, "না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং এর কোনো কিছুই আর ফেরত নিয়ে আসেনি।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর: ৯৬৯)
বর্তমান সময়ের এই কঠিন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন চারপাশের সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, তখন জিলহজের এই বরকতময় দিনগুলো আমাদের সমাজে এক বড় সহমর্মিতার সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারে। এই দিনগুলোর প্রথম নয়টি দিন রোজা রাখা এবং জবান সিক্ত রেখে বেশি বেশি আল্লাহর নাম (তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ) নেওয়া মানুষের মনকে শান্ত ও অহংকারমুক্ত করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "অতএব, তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদুলিল্লাহ পড়ো।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর: ৫৪৪৪)
বিশেষ করে ৯ জিলহজ অর্থাৎ ‘আরাফাহর দিনের’ রোজা মানুষের বিগত ও আগামী এক বছরের ভুলত্রুটি ও গুনাহ খাতা ক্ষমা করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরাফাহর দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, "তা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) স্বরূপ।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১১৬২)
আজকের ভোগবাদী সমাজে সবচেয়ে বড় অভাব হলো পারস্পরিক ভালোবাসার। আমরা যখন লাখ টাকা দিয়ে কেনা পশুর বাহ্যিক যত্ন নিতে ব্যস্ত থাকি, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই সুন্দর সুন্নাহর কথা ভুলে যাই যেখানে জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি পর্যন্ত নিজের নখ, চুল বা পশম না কাটার নির্দেশ রয়েছে।
হাদিসের রেফারেন্স: উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন তোমরা জিলহজ মাসের চাঁদ দেখতে পাবে এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা করবে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৯৭৭)
এই ছোট আমলটি মূলত একজন মানুষকে পবিত্র হজে যাওয়া হাজীদের ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক রূপচর্চা বা আভিজাত্যের বড়াই করার চেয়ে আল্লাহর দরবারে মনের পরিচ্ছন্নতাই শেষ কথা।
কোরবানি কেবল একটি পশু জবাই করার উৎসব নয়, এটি নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা আর সামাজিক অহংকারের ওপর ছুরি চালানোর বার্ষিক পরীক্ষা।
আমাদের চারপাশের প্রতিবেশী বা ছিন্নমূল মানুষগুলো যখন ভালো একবেলা খাবারের জন্য কষ্ট করছে, তখন আমাদের উৎসবের আড়ম্বর যেন কেবলই লোকদেখানো না হয়। জিলহজের এই প্রথম দশ দিন আমাদের পশুর হাটের কৃত্রিম ব্যস্ততা থেকে বের হয়ে নিজেদের অন্তরের দিকে তাকানোর তাগিদ দেয়। আমরা যদি এই দিনগুলোর আসল শিক্ষা—নিজের স্বার্থ ত্যাগ করা, নিয়ম মেনে চলা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা—আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ধরে রাখতে পারি, তবেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে এবং সমাজে সত্যিকারের বৈষম্যহীন শান্তি ফিরে আসবে। অলসতা বা কেবল উৎসবের আমেজে মগ্ন হয়ে এই মূল্যবান সময় নষ্ট করা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
লেখক: ইসলামী গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।

