বছর ঘুরে আবার এলো পবিত্র ঈদুল আজহা। এই দিনে আল্লাহর মুমিন বান্দা ও শিশুরা দারুণভাবে আনন্দ উপভোগ করে। সব শ্রেণির মানুষই এই দিনে ব্যস্ত থাকে। সকালবেলা ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে যাওয়া এবং কুরবানির পশু জবেহ করার মাধ্যমে দিনটি আনন্দের উৎসবে পরিণত হয়। এই দিনে কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করা যায়।
'আজহা' শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ, আর 'ঈদ' শব্দের অর্থ উৎসব। 'উজহিয়্যা' শব্দ দিয়ে সেই পশুকে বোঝানো হয়, যা কুরবানির দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবেহ করা হয়। অন্যদিকে 'কুরবুন' শব্দ থেকে 'কুরবান' শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য বা উৎসর্গ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সব চতুষ্পদ পশু দিয়েছি, সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ, সুতরাং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনীত ব্যক্তিদের।" (সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত: ৩৪)
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল কুরবানি করেছিলেন।
মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানি
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি তাদেরকে (আহলে কিতাবদের) আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল ও কাবিলের) ঘটনা সঠিকভাবে পাঠ করে শুনিয়ে দাও; যখন তারা উভয়েই এক একটি কুরবানি উপস্থিত করল এবং তন্মধ্যে হতে একজনের (হাবিলের) কুরবানি কবুল হলো এবং অপরজনের কবুল হলো না। অপরজন বলতে লাগল, 'আমি তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করব'; প্রথমজন বলল, 'আল্লাহ তো কেবল পরহেজগারদের (আল্লাহভীরুদের) আমলই কবুল করে থাকেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য হাত প্রসারিত করো, তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে কখনো হাত বাড়াব না; আমি তো বিশ্বজগতের রব আল্লাহকে ভয় করি।'" (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ২৭-২৮)
হযরত মা হাওয়া (আ.)-এর গর্ভে হাবিলের সাথে লিওয়া এবং কাবিলের সাথে এক্বলিমা জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কাবিলের সহোদরা এক্বলিমা তার জন্য হারাম ছিল এবং হাবিলের সহোদরা লিওয়া তার জন্য হালাল ছিল। কিন্তু এক্বলিমা অধিকতর সুন্দরী হওয়ায় কাবিল তাকেই বিয়ে করতে চাইল। হযরত আদম (আ.) এতে নিষেধ করলে কাবিল দাবি করল, এটি আল্লাহর হুকুম নয়, বরং আদমের নিজস্ব অভিমত।
তখন আদম (আ.) বললেন, "তোমরা দুজনেই আল্লাহর দরবারে কুরবানি করো। যার কুরবানি আকাশ থেকে আগুন এসে জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে, সে-ই সত্যবাদী বলে গণ্য হবে।" তদনুযায়ী কাবিল তার নিকৃষ্ট গমের স্তূপ এবং হাবিল তার সেরা একটি উট বা দুম্বা জবেহ করে পাহাড়ের চূড়ায় রাখল। অতঃপর অদৃশ্য থেকে আগুন এসে হাবিলের উৎসর্গকৃত পশুটি জ্বালিয়ে দিয়ে গেল (যা কুরবানি কবুল হওয়ার লক্ষণ ছিল), আর কাবিলের গমগুলো তেমনি পড়ে রইল। এটি দেখে কাবিল হিংসায় জ্বলে উঠল। মানব ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বপ্রথম কুরবানি এবং কুরবানি কবুল হওয়ার প্রাচীন পদ্ধতি।
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির ইতিহাস
হযরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অত্যন্ত প্রিয় ও কলিজার টুকরো সন্তান। ইব্রাহিম (আ.) তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ ও ভালোবাসতেন। জিলহজ মাসের ৮ তারিখ রাতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে আদেশ করছেন, "হে ইব্রাহিম! তুমি আল্লাহর নামে কুরবানি করো।" হযরত ইব্রাহিম (আ.) সকালে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর নামে অনেক ধন-সম্পদ দান করলেন।
পরের রাতে তিনি আবার একই স্বপ্ন দেখলেন। ভোরে উঠে তিনি আল্লাহর নামে একশত উট কুরবানি করলেন। কিন্তু তার পরের রাতেও তিনি একই স্বপ্ন দেখলেন, যেখানে আল্লাহ বলছেন, "ইব্রাহিম! তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি আল্লাহর নামে কুরবানি করো।"
ভোরে উঠে তিনি চিন্তায় মগ্ন হলেন—তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোনটি? দীর্ঘ চিন্তার পর তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র প্রিয় সন্তান ইসমাইলের চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সন্তানকে উৎসর্গ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন।
এরপর তিনি সন্তানকে ডেকে বললেন, "প্রিয় বৎস! আমি এক জায়গায় যাব, তুমিও আমার সঙ্গে চলো।" পিতার কথায় আনন্দিত হয়ে হযরত ইসমাইল (আ.) মায়ের কাছে গিয়ে বললেন, "আম্মা! আমি আব্বার সঙ্গে বাইরে যাচ্ছি।" বিবি হাজেরা স্বামীর কাছে জানতে চাইলেন, "ইসমাইল বলছে আপনি তাকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছেন, ঘটনা কি সত্যি?" হযরত ইব্রাহিম (আ.) বললেন, "হ্যাঁ হাজেরা, তুমি ওকে গোসল করিয়ে ভালো পোশাক পরিয়ে দাও।" বিবি হাজেরা সন্তানকে পরম যত্নে সাজিয়ে স্বামীর হাতে সমর্পণ করে বললেন, "প্রিয় স্বামী! আজ পর্যন্ত ইসমাইলকে কখনো চোখের আড়াল করিনি। আজ প্রথম আপনার সাথে বাইরে পাঠাচ্ছি, তাকে নিজের নজরে রাখবেন।"
হযরত ইব্রাহিম (আ.) একটি ধারালো ছুরি ও রশি কাপড়ের নিচে লুকিয়ে পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে মিনা পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন। পথে ইবলিস শয়তান বিবি হাজেরার কাছে এসে প্ররোচনা দিয়ে বলল, "তুমি কি জানো, তোমার স্বামী তোমার সন্তানকে জবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছে?" বিবি হাজেরা শয়তানের কথা শুনে দৃঢ়তার সাথে বললেন, "যদি আল্লাহর আদেশে তা করা হয়, তবে তা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আল্লাহ আমার সন্তানকে কুরবানির জন্য কবুল করছেন, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!"
এরপর শয়তান হযরত ইসমাইল (আ.)-কে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করল। ইসমাইল (আ.) প্রকৃত ঘটনা শুনে বললেন, "আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি হতে পারা তো পরম সৌভাগ্যের বিষয়। দূর হও অভিশপ্ত শয়তান!" শয়তানের এই প্ররোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা তাকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। এই ঐতিহাসিক স্মৃতিরক্ষার্থেই আজ পর্যন্ত মুসলিম সমাজ হজের সময় নির্দিষ্ট স্থানে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে থাকে।
কিছু দূর যাওয়ার পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর সন্তানকে মূল উদ্দেশ্যটি খুলে বললেন, যা পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে: "প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন বলো, এ বিষয়ে তোমার মতামত কী?" সে বলল, "হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা (নিশ্চিন্তে) করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।" (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)
অতঃপর পিতা-পুত্র মিনা প্রান্তরে উপনীত হলেন। হযরত ইসমাইল (আ.) বললেন, "পিতা! আমাকে জবেহ করার পূর্বে আমার তিনটি অনুরোধ রক্ষা করুন। প্রথমত, আমার হাত-পা ভালোভাবে বেঁধে নিন, যেন জবেহ করার সময় ব্যথার চোটে আমি নড়াচড়া না করি। দ্বিতীয়ত, আমাকে উপুড় করে শোয়ান, যেন জবেহ করার সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আপনার পিতৃস্নেহ উথলে না ওঠে এবং ছুরির হাত শিথিল না হয়ে যায়। তৃতীয়ত, জবেহ করার সময় আপনার চোখ দুটি কাপড় দিয়ে বেঁধে নিন; আর ঘরে ফিরে আমার দুখিনী মাকে সান্ত্বনা দেবেন এবং আমার রক্তমাখা জামাটি তাঁকে সমর্পণ করে আল্লাহর নির্দেশের কথা জানাবেন। তাঁকে আমার শেষ সালাম পৌঁছে দেবেন।"
হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্রের কথায় সায় দিয়ে রশি দিয়ে তার হাত-পা শক্ত করে বাঁধলেন এবং মাটিতে উপুড় করে শোয়ালেন। এরপর সুতীক্ষ্ণ ছুরি বের করে নিজের চোখ বেঁধে সজোরে ইসমাইল (আ.)-এর গলায় চালালেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে ছুরিটি একচুলও কাটল না।
হযরত ইসমাইল (আ.) তখন বললেন, "হে পিতা! আপনি সম্ভবত সন্তানের মায়ায় জড়িয়ে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে পারছেন না। এতে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হতে পারে। দয়া করে আবার চেষ্টা করুন।" হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুনরায় দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ছুরি চালালেন, কিন্তু এবারও গলা কাটল না।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) ক্ষোভে ও বিস্ময়ে ছুরিটি দূরে ছুড়ে মারলেন। ছুরিটি একটি পাথরের ওপর গিয়ে পড়ল এবং পাথরটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এরপর ইব্রাহিম (আ.) চোখের বাঁধন খুলে দেখলেন, তাঁর পাশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) একটি জান্নাতি দুম্বা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং হযরত ইসমাইল (আ.) অক্ষত অবস্থায় হাসছেন।
জিবরাইল (আ.) বললেন, "হে ইব্রাহিম! আল্লাহ আপনাদের উভয়ের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট। আপনারা পিতা-পুত্র দুজনেই আল্লাহর কঠিন পরীক্ষায় পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহ আপনার কুরবানি কবুল করেছেন এবং ইসমাইলের পরিবর্তে এই দুম্বাটি জবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।" হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন পরম সুখে আল্লাহর নামে সেই দুম্বাটি জবেহ করলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি এক মহান কুরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।" (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০৫-১০৭)
লেখক: আলেম ও গবেষক।

