ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এখানে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য যেমন নিয়তের শুদ্ধতা প্রয়োজন, তেমনি উপার্জন হালাল হওয়াও অপরিহার্য। কুরবানি হলো ইসলামের অন্যতম একটি বিধান; আর্থিক ও শারীরিক ইবাদতের এক অপূর্ব সমন্বয়। প্রতিবছর জিলহজ মাসে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করে থাকেন। তবে বর্তমানে হালাল ও হারামের মিশ্রণ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সুদ, ঘুষ, নাচ-গান বা অন্যান্য অনৈসলামিক উপায়ে উপার্জিত অর্থ এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই প্রেক্ষিতে, হারাম মাল দ্বারা কুরবানি করার বিধান কী, এর ফলে অন্যান্য শরিকদের কুরবানির ওপর কী প্রভাব পড়ে এবং এই বিষয়ে একজন মুসলিমের করণীয় কী—তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কুরবানির হাকিকত
কুরবানি শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়। কুরবানির মূল হাকিকত হলো পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে নিজের ভেতরের পশুবৃত্তিকে জবেহ করা এবং অহংকার, লোকদেখানো মানসিকতা ও দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করা। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য গোশত খাওয়া বা সামাজিক প্রভাব প্রদর্শন করা নয়; বরং কুরবানি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। যেমনটি আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— "আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না ওগুলির গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা হজ, আয়াত: ৩৭)
কুরবানি কেন করা হয়?
কুরবানি মূলত আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং তাঁর সীমাহীন আনুগত্যের এক ঐতিহাসিক স্মারক। কুরবানির মৌলিক কারণগুলো নিম্নরূপ:
সুন্নতে ইবরাহিমির পুনরুজ্জীবন: হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) আল্লাহর আদেশে যে অভূতপূর্ব ত্যাগের নজির পেশ করেছিলেন, কুরবানি মূলত তারই ধারাবাহিকতা ও স্মারক।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের পরীক্ষা: নিজের প্রিয় সম্পদ ও অর্থ ব্যয় করে আল্লাহর নামে পশু জবেহ করার মাধ্যমে বান্দা প্রমাণ করে যে, তার কাছে নিজের মালের চেয়ে আল্লাহর হুকুমের মূল্য অনেক বেশি।
গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভূতি: কুরবানির মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মাঝে গোশত বণ্টন করা হয়, যা সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে।
হারাম মাল দিয়ে কুরবানি করার বিধান
শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, কুরবানি সম্পূর্ণ হালাল মাল দ্বারা হতে হবে। সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ, চুরি কিংবা নাচ-গণের মতো নিষিদ্ধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কুরবানি করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
শুধু হারাম মাল থাকলে কুরবানিই ওয়াজিব হয় না
শরয়ী দৃষ্টিতে যদি কোনো ব্যক্তির কাছে শুধুই হারাম মাল থাকে, তাহলে সেই মালের ওপর কুরবানি ও জাকাত কোনোটিই ওয়াজিব হয় না। কারণ, হারাম মালের ওপর দখলদারের মালিকানাই সাব্যস্ত হয় না। ফতোয়ায়ে শামিতে উল্লেখ আছে: "হারাম মাল যদি নিসাব পরিমাণও হয়, তবুও তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হবে না। কারণ, সম্পূর্ণ মালটিই ঐ ব্যক্তির উপর সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।" (ফতোয়ায়ে শামি: ২/২৯১)। অতএব, যার পুরো সম্পদই হারাম, তার ওপর কুরবানি করার কোনো বিধান নেই। তবুও যদি সে এই টাকা দিয়ে কুরবানি করে, তাহলে তার কুরবানি হবে না এবং আল্লাহর দরবারে ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।
হালাল ও হারাম সম্পদের মিশ্রণ থাকলে করণীয়
যদি হালাল মালের সাথে হারাম মাল মিশ্রিত হয়ে যায়, তাহলে সেই মিশ্রিত সম্পদ থেকে হারাম মালের সমপরিমাণ অংশ আলাদা করে দিতে হবে। এরপর অবশিষ্ট হালাল মালের পরিমাণ যদি নিসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি হয়, তবে তার ওপর জাকাত ও কুরবানি ওয়াজিব হবে। আর যদি হারাম অংশ আলাদা করার পর অবশিষ্ট হালাল মাল নিসাব পরিমাণের চেয়ে কম হয়, তবে তার ওপর জাকাত ও কুরবানি ওয়াজিব হবে না। অবশ্যই মালের হারাম অংশটি যদি মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে তা ফিরিয়ে দেবে। অন্যথায় সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তা সদকা করে দেবে। অর্থাৎ, নিজের পক্ষ থেকে সওয়াবের আশা না করে, উক্ত মালের যিনি প্রকৃত হকদার বা মালিক, তাঁর পক্ষ থেকে সওয়াবের নিয়ত করবে।
এই কুরবানিতে শরিক বা অংশীদারদের বিধান
ভাগে কুরবানি করার সময় শরিকদের আয়ের উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বড় পশুতে (যেমন: গরু, মহিষ, উট) একাধিক ব্যক্তি শরিক হয় এবং তাদের মধ্যে কোনো একজনের সম্পূর্ণ টাকা বা অধিকাংশ টাকা হারাম হয়, তাহলে তার সাথে কুরবানি করা জায়েজ হবে না। এরকম ব্যক্তির সাথে কুরবানিতে শরিক হলে উক্ত পশুতে শরিক সবার কুরবানি বাতিল হয়ে যাবে। (খুলাসাতুল ফাতওয়া: ৪১৫)।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন আম্বিয়াগণকে। সুতরাং তিনি আম্বিয়াগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, 'হে রসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার করো এবং সৎকাজ করো। তোমরা যা করো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।' (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১)। আর তিনি (মুমিনদের উদ্দেশ্যে) বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সব রিজিক দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করো।' (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৭২)।"
অঁতপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দুটিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে, "হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!" কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার প্রতিপালন হয়েছে। অতএব তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে? (সহিহ মুসলিম: ২৩৯৩, সহিহ তিরমিজি: ২৯৮৯)।
হারাম মাল দিয়ে কুরবানি দাতার শাস্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, হারাম উপার্জন করা মানুষের ইবাদত ও দুআ কবুল হওয়ার পথে বড় বাধা। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত-ধূলিমলিন অবস্থায় আল্লাহর কাছে হাত তুলে কাঁদে, "হে আমার রব!" অথচ তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক সবই হারাম; তাই তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে! তদ্রূপ, সুদ ও হারামের সাথে জড়িত থাকা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যদি তোমরা সুদ বর্জন না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।" (সূরা বাকারা: ২৭৯)। অতএব, হারাম মাল দ্বারা কুরবানি, সদকা বা কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না; বরং তা আখিরাতে ভয়াবহ ক্ষতি ও শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একজন মুসলিমের করণীয়
উপরিউক্ত শরয়ী আলোচনার পর একজন মুমিন হিসেবে আমাদের জীবন ও ইবাদত পরিশুদ্ধ করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক:
১. আত্মপর্যালোচনা ও হিসাব-নিকাশ: কুরবানির দিন আসার আগেই নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যবসা এবং আয়ের উৎসগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। নিজের উপার্জনে সুদের লভ্যাংশ বা কোনো অন্যায্য টাকা ঢুকে আছে কি না, তা সতর্কতার সাথে আলাদা করতে হবে।
২. হারাম মাল ত্যাগের শরয়ী পদ্ধতি: যদি নিজের কাছে কোনো হারাম মাল থেকে থাকে, তবে তার বিধান হলো, যদি তার আসল মালিক বা ওয়ারিশদের সন্ধান জানা থাকে, তাহলে তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া অপরিহার্য। আর যদি মালিকের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হয়, তাহলে সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই সম্পূর্ণ টাকা কোনো গরিব বা জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিকে সদকা করে দিতে হবে। হারাম টাকা নিজের ভোগে বা কুরবানির মতো ইবাদতে ব্যবহার করা যাবে না।
৩. হালাল মাল দিয়ে কুরবানির সংকল্প: আমাদের যদি সামর্থ্য কমও থাকে, kingdom তবুও কষ্টের উপার্জিত অল্প হালাল টাকা দিয়ে ছোট একটি पशु বা ছাগল কুরবানি করা হাজার গুণ উত্তম কোটি টাকার হারাম মালের জাঁকজমকপূর্ণ কুরবানির থেকে।
৪. শরিক নির্বাচনে সতর্কতা: যখন আমরা যৌথভাবে কুরবানি দেব, তখন অবশ্যই দ্বীনদার, পরহেজগার এবং হালাল উপার্জনকারী ব্যক্তিদের শরিক হিসেবে নির্বাচন করতে হবে। এতে আমাদের কুরবানি কবুল হবে এবং এর মাকসাদ অর্জিত হবে।
৫. তওবা ইস্তিগফার: অতীতের অনিচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করতে হবে এবং আজই সুদ, ঘুষ ও সমস্ত হারাম মাধ্যমকে চিরতরে 'না' বলতে হবে।
উপসংহার
কুরবানি কেবল একটি উৎসব বা প্রথা নয়, এটি আল্লাহর দরবারে বান্দার আত্মনিবেদনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের বাহ্যিক জাঁকজমক দেখেন না, তিনি দেখেন আমাদের অন্তরের তাকওয়া এবং আমাদের সম্পদের পবিত্রতা। তাই আসুন, এই কুরবানিতে আমরা আমাদের উপার্জনকে সম্পূর্ণ খাঁটি ও হালাল করার শপথ নিই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র মাল দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সহিহভাবে কুরবানি করার তৌফিক দান করুন।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।

