মা-বাবা পৃথিবীতে সন্তানের জন্য আল্লাহ তাআলার এক অমূল্য নিয়ামত। তাঁদের মাধ্যমে সন্তান এ পৃথিবীর আলো দেখে, লালন-পালন পায় এবং জীবনের প্রথম শিক্ষা লাভ করে। ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, মা-বাবা ইন্তেকাল করার পর তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, ইসলাম এ ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং কোরআন-হাদিসের আলোকে জানা যায়, মৃত্যুর পরও মা-বাবার কিছু হক সন্তানের ওপর বহাল থাকে এবং সেসব হক আদায়ের মাধ্যমে সন্তান তাঁদের উপকার করতে পারে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।" — (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩)
এ নির্দেশ শুধু তাঁদের জীবদ্দশার জন্য নয়; বরং মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি সম্মান, দোয়া ও কল্যাণ কামনার মধ্য দিয়ে এ দায়িত্ব অব্যাহত থাকে।
মৃত্যুর পরও কি মা-বাবার হক থাকে?
এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আমার মা-বাবার মৃত্যুর পরও কি তাঁদের প্রতি কোনো সদাচরণ অবশিষ্ট আছে, যা আমি করতে পারি?"
তিনি উত্তরে বললেন: "হ্যাঁ। তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের অসিয়ত বাস্তবায়ন করা, তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৪২; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৬৬৪)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর মাধ্যমে মা-বাবার হক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
মা-বাবার জন্য দোয়া করা
মৃত্যুর পর মা-বাবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার হলো সন্তানের দোয়া। আল্লাহ তাআলা কোরআনে শিক্ষা দিয়েছেন: "হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।" — (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: "মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
এ হাদিসে নেক সন্তানের দোয়াকে মৃত ব্যক্তির জন্য অব্যাহত কল্যাণের অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষমা ও মাগফিরাতের জন্য প্রার্থনা
সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব হলো মা-বাবার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে।" — (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪১)
নিয়মিত দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে সন্তান তার মা-বাবার জন্য কল্যাণ কামনা করতে পারে।
সদকা ও দান-খয়রাত করা
মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে দান-সদকা করাও তাঁদের উপকারে আসে। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, "আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমি মনে করি, তিনি কথা বলতে পারলে সদকা করার নির্দেশ দিতেন। আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করি, তাহলে কি তিনি সওয়াব পাবেন?"
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: "হ্যাঁ।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৪)
তাই গরিবদের সাহায্য করা, মসজিদ, মাদরাসা বা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করা এবং সেই সওয়াব মা-বাবার জন্য ঈসালে সওয়াব করা একটি উত্তম আমল।
সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা
মা-বাবার জন্য চলমান সওয়াবের ব্যবস্থা করাও সন্তানের বড় দায়িত্ব। যেমন—নলকূপ স্থাপন করা, কোরআন শরিফ বিতরণ করা, মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করা, দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়া, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা ইত্যাদি। এসব কাজের সওয়াব মা-বাবার রূহের জন্য উৎসর্গ করা যেতে পারে।
অসমাপ্ত অসিয়ত পূরণ করা
মা-বাবা শরিয়তসম্মত কোনো অসিয়ত করে গেলে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সন্তানের দায়িত্ব। উল্লিখিত আবু দাউদের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর পর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের মধ্যে তাঁদের অসিয়ত বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করেছেন।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
মা-বাবার মৃত্যুর পর তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: "পিতার সঙ্গে সদাচরণের সর্বোত্তম উপায় হলো তার মৃত্যুর পর তার প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫২)
আজ অনেকেই মা-বাবার মৃত্যুর পর চাচা, ফুফু, মামা, খালা কিংবা অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। অথচ এটি ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করা
মৃত্যুর পর মা-বাবার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সম্মান করাও তাঁদের হক আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) একবার তাঁর পিতার এক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাঁকে বিশেষ সম্মান ও উপহার প্রদান করেন। পরে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ বাণী উল্লেখ করেন: "নিশ্চয়ই সর্বোত্তম সদাচরণ হলো, পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫২) এটি মা-বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও একটি সুন্দর মাধ্যম।
হজ ও উমরা আদায় করা
যদি মা-বাবার ওপর ফরজ হজ বাকি থাকে এবং সন্তান সে সুযোগ পায়, তাহলে তাঁদের পক্ষ থেকে হজ বা উমরা আদায় করতে পারে। এক নারী রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, "আমার মায়ের ওপর হজ ফরজ হয়েছিল, কিন্তু তিনি হজ করার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ করতে পারি?"
তিনি বললেন: "হ্যাঁ, তাঁর পক্ষ থেকে হজ করো।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৫২)
ঋণ পরিশোধ করা
মা-বাবার কোনো বৈধ ঋণ থাকলে তা পরিশোধের চেষ্টা করাও সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তাই মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা তাঁর প্রতি বড় উপকার।
মা-বাবার জন্য কোরআন তিলাওয়াত ও নেক আমল
হানাফি ফিকহসহ অধিকাংশ ফকিহের মতে, কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সওয়াব করা যায়। তাই সন্তান নিজের নেক আমলের সওয়াব মা-বাবার জন্য উৎসর্গ করতে পারে।
সমাপনী কথা
বর্তমান সমাজে অনেক সন্তান জীবিত অবস্থায় মা-বাবার যথাযথ খোঁজখবর নেয় না, আবার মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য নিয়মিত দোয়া করতে ভুলে যায়। অথচ একজন সন্তান যত ব্যস্তই হোক, প্রতিদিন কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে মা-বাবার জন্য দোয়া করা তার জন্য কঠিন কোনো কাজ নয়। মনে রাখা দরকার, আজ আমরা আমাদের মা-বাবার জন্য দোয়া করছি; একদিন আমাদের সন্তানরাও আমাদের জন্য দোয়া করবে। তাই পরিবারে এ সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মোট কথা, মৃত্যুর মাধ্যমে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না; বরং নতুন এক দায়িত্বের সূচনা হয়। তাঁদের জন্য দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, দান-সদকা করা, সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, বন্ধুদের সম্মান করা এবং তাঁদের অসমাপ্ত দায়িত্ব পূরণের চেষ্টা করা—এসবই মৃত্যুর পর মা-বাবার হক আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
প্রকৃত সৌভাগ্যবান সেই সন্তান, যে জীবদ্দশায় মা-বাবার সেবা করে এবং মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য কল্যাণের দরজা খোলা রাখে। কারণ মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত, আর তাঁদের জন্য আন্তরিক দোয়া ও নেক আমল সন্তানের জন্যও নাজাত ও বরকতের কারণ হতে পারে।
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

