বর্তমান যুগ নানামুখী ফিতনা-ফাসাদে জর্জরিত। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ আজ এসব বহুমুখী আগ্রাসনের শিকার। আমাদের চারপাশে পাপের নানাবিধ আয়োজন; গোনাহের অনলে দগ্ধ হচ্ছে গোটা সমাজ। চারিদিকে অন্যায়, অবিচার আর প্রশাসনে লাগামহীন দুর্নীতির মহড়া চলছে। বিনোদনের নামে মিডিয়ায় পাপাচারের বৈচিত্র্যময় আয়োজন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি নর্তকী, গায়ক, নায়ক ও কথিত তারকারা ছড়িয়ে দিচ্ছেন নগ্নতা ও অশ্লীলতা। গোনাহের এই কলুষিত পরিবেশের অশুভ পরিণতিতে পরিবারগুলো জ্বলছে পরকীয়ার আগুনে, আর অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে, সমাজের সর্বস্তরে।
ফলে মানুষের মনে তীব্র অশান্তি ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বস্তুবাদের অন্ধ আগ্রাসনে লিপ্ত হয়ে মানুষ অসৎ উপায়ে পার্থিব উন্নতি অর্জনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। বাহ্যিক চটক ও বৈষয়িক উন্নয়নকেই আজ প্রকৃত অগ্রগতি বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু নৈতিক ও আত্মিক উন্নতির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় উন্নয়নের নামে যা কিছু হচ্ছে, তা মানুষের মনের অস্থিরতাই বাড়িয়ে চলেছে। এমতাবস্থায়, একটুখানি শান্তির খোঁজে, পরম প্রশান্তির আশায় মানুষ ব্যাকুল হয়ে মুক্তির পথ সন্ধান করছে।
প্রশান্তির প্রকৃত ঠিকানা
প্রকৃতপক্ষে শান্তির একমাত্র পথ ও ঠিকানা হলো ইসলামের পথ—ঈমান ও ইহসানের পথ, তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির পথ। এই পথের পথিক, সাধক ও পথপ্রদর্শকেরা প্রকৃত শান্তির নীড়ে বসবাস করেন। প্রশান্তির এক চিরসবুজ উদ্যানে তাদের নিত্য বিচরণ। যিকির ও ফিকিরের শান্তিময় আবহে কাটে তাদের দিনরাত। গভীর রাতে যখন নিঝুম হয়ে আসে চারপাশ, ‘আল্লাহু আল্লাহু’ জিকিরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির ছোঁয়া লাভ করে এই কাফেলা। শেষ রাতের নির্জনতায় তাহাজ্জুদের সেজদায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর সঙ্গে চলে তাদের প্রেমের কথোপকথন।
আল্লাহর পথের এই নিষ্ঠাবান পথিক বা ‘সালেক’ এভাবেই শান্তির জগতে অবগাহন করেন। নফসের কুপ্রবৃত্তির বহুমুখী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে তারা প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যান। এই পথ পাড়ি দিতে হয় কঠোর মুজাহাদা, রিয়াজত, দীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ সাধনা ও কঠোর ত্যাগের পর একজন সাধক খুঁজে পান কাঙ্ক্ষিত শান্তির পথ।
এই পথ মূলত আল্লাহর প্রতি নিখাদ মহব্বত ও ভালোবাসার পথ। রবের সমস্ত বিধান সানন্দে মেনে নিয়ে তাঁর সমীপে পূর্ণ আত্মসমর্পণের পথ। আখেরি নবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য ও তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসাই সালেকের একমাত্র পাথেয়। সুন্নাহর আলোয় নিজের জীবনকে সুন্দর করে সাজানোর মধ্যেই সালেকের প্রকৃত সার্থকতা, আর এই পথেই অর্জিত হয় হৃদয়ের পরম প্রশান্তি।
কলবের ব্যাধি ও সুযোগ্য চিকিৎসক
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী অনুযায়ী, মানবদেহে একটি মাংসপিণ্ড আছে; সেটি পরিশুদ্ধ ও সৎ থাকলে পুরো শরীর পরিশুদ্ধ থাকে। আর সেটি কলুষিত ও নষ্ট হয়ে গেলে গোটা শরীর অসুস্থ ও অকেজো হয়ে পড়ে। এই মাংসপিণ্ডটিই হলো আমাদের ‘কলব’ বা হৃদয়। বাহ্যিকভাবে এটি শরীরে রক্তপ্রবাহ সচল রাখে এবং মানুষকে সতেজ রাখে। এটি মানবদেহের রাজা, আর বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো প্রজা। রাজা সৎ ও সঠিক হলে প্রজারাও সুপথে চলে; আর রাজা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে প্রজারাও অবাধ্য হয়ে পড়ে।
এটি কলবের বাহ্যিক ও শারীরবৃত্তীয় দিক, যার চিকিৎসা করেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এই কলবের আরেকটি বিশাল জগৎ আছে—তা আধ্যাত্মিক বা ভাবজগৎ। এই হৃদয়েই বাসা বাঁধে হিংসা, অহংকার, আমিত্ব, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, অমঙ্গল কামনা, লোভ-লালসা, গিবত, শিকায়েত, দুনিয়ার মোহ ও কৃপণতার মতো মারাত্মক আত্মঘাতী ব্যাধি। এগুলোর নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন দক্ষ আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের, যাঁদের ডাকা হয় তাবীবে কলব, পীর, মুরশিদ, রাহবর বা শায়খ।
এই চিকিৎসকদের অবশ্যই কিছু অপরিহার্য গুণ থাকতে হবে :
· শরীয়তের পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞান।
· অন্তরের রোগ ও তার নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা।
· নিজস্ব জীবন সুন্নাহর আলোয় আলোকিত।
· ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’-এর বিশুদ্ধ আকীদা।
বর্তমান সমাজে একশ্রেণির ভণ্ড ও নকল পীরের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তাদের অপচিকিৎসা ও বিভ্রান্তির ফলে মাজারপূজা ও পীরপূজার মতো শিরক ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দুয়ানি সাধনা বা গ্রিক দর্শনের আলোকে আত্মশুদ্ধির নামে অপচিকিৎসা চলছে। এসব গোমরাহি থেকে অন্তরের রোগীদের মুক্ত করতে প্রয়োজন এমন আধ্যাত্মিক শায়খ, যাঁরা মানুষের অন্তরকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় সাজিয়ে তুলবেন; দিলের বাগানকে কুরআন-সুন্নাহর ফল ও ফুলে সুশোভিত করবেন।
তাঁরা পথিককে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত প্রকৃত ‘তাযকিয়া’ ও ‘ইহসান’-এর পথ দেখাবেন। নইলে পীরালির ছদ্মবেশে একদল চোর-ডাকাত মানুষের ঈমান হরণ করবে। তাসাউফের এই পথ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠিন। তাই পথিক ও পথপ্রদর্শক—উভয়কেই অত্যন্ত সতর্কতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আল্লাহর মহব্বতের চূড়ান্ত মঞ্জিলে পৌঁছাতে হবে।
আধ্যাত্মিক সঙ্গী ও শায়খের প্রয়োজনীয়তা
মানুষের অন্তরে নানাবিধ অনুভূতির বাস। আল্লাহর ভয় বা তাকওয়ার মূল ঠিকানা এই কলব। অন্তরেই বিরাজ করে ভালোবাসা ও মানবীয় উত্তম গুণাবলি। দানশীলতা, পরোপকার, সেবামূলক মানসিকতা, বিনয়, কল্যাণকামিতা, পরকালের মুক্তিচিন্তা, জান্নাতের ব্যাকুলতা, পবিত্রতা, চোখ-কানকে গোনাহমুক্ত রাখার সংকল্প—সবই উৎপন্ন হয় এই হৃদয় থেকে। এককথায়, ‘আখলাকে হাসানা’ বা সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটে এখানেই।
এই গুণাবলি বিকশিত করতে হলে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হয়। আর এই দীর্ঘ ও জটিল পথচলায় একজন অভিজ্ঞ সহযাত্রী বা পথপ্রদর্শক পেলে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়। এই আধ্যাত্মিক সঙ্গী পথের প্রতিটি অলিগলি, আলো-আঁধার ও বিপত্তি সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন। তাসাউফের পরিভাষায় এই অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকই হলেন পীর, মুরশিদ, রাহবর, শায়খ বা মুযাক্কি।
যেমন কেবল বইপুস্তক পড়ে কেউ নিজের শারীরিক রোগের চিকিৎসা করতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ঠিক তেমনি আধ্যাত্মিক ব্যাধি ও কলবের চিকিৎসায় একজন যোগ্য শায়খের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। তাঁর সান্নিধ্য ও অভিজ্ঞতা ছাড়া এই কণ্টকাকীর্ণ পথ একা পারি দেওয়া অসম্ভব।
লেখক: আলেম, গবেষক, শিক্ষাবিদ; প্রতিষ্ঠাতা, সেন্টার ফর স্প্রিচুয়্যাল স্টাডিজ

