Logo

ধর্ম

তীব্র গরম ও সূর্যের কিরণ

ইসলামি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রয়োজন

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১৫

ইসলামি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রয়োজন

​মে, জুন ও জুলাই মাসে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হয়। এ সময় হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা বেড়ে যায়। অনেকের ধারণা— এই সময় সূর্য পৃথিবীর দিকে “নিচে নেমে আসে”, তাই গরম বৃদ্ধি পায়।

​কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করে, সূর্য পৃথিবীর দিকে নেমে আসে না। বরং পৃথিবীর অক্ষের হেলন, সূর্যের কিরণের কোণ, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে গরম বৃদ্ধি পায়। ইসলামও প্রকৃতির এই নিয়মকে আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সূর্য কি নিচে নেমে আসে?

​বৈজ্ঞানিকভাবে সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে এবং এর দূরত্ব প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। গরম বাড়ার কারণ সূর্যের কাছে চলে আসা নয়।

গরম বেশি অনুভূত হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—

​পৃথিবীর ২৩.৫° অক্ষ হেলন (Axial tilt)

​সূর্যের কিরণ সরাসরি বা খাড়া কোণে পড়া

​বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি

​শহরের কংক্রিট ও মাটির তাপ শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি। ফলে সূর্য একই দূরত্বে থাকলেও তাপমাত্রা অনেক বেশি অনুভূত হয়।

হিটস্ট্রোক কেন হয়?

​হিটস্ট্রোক হলো শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যাওয়া। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড রোদে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়।

হিটস্ট্রোকের প্রধান কারণ:

​দীর্ঘ সময় রোদে থাকা

​শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি

​আর্দ্র পরিবেশে ঘাম শুকাতে না পারা

​অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম

​লক্ষণ:

​শরীরের তাপমাত্রা ৪০°C বা তার বেশি

​মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা

​অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

​ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া

​বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা

​চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হাইপোথ্যালামাস সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে পানিশূন্যতা, রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এতে হিটস্ট্রোক, অজ্ঞানতা এমনকি মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে।

কোরআনে সূর্য সম্পর্কে নির্দেশনা

​আল্লাহ তাআলা কোরআনে সূর্যকে তাঁর নিদর্শন ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।— (সুরা ইউনুস: ৫) তিনি সূর্যকে আলো এবং চাঁদকে জ্যোতি বানিয়েছেন এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।— (সুরা ইয়াসিন: ৩৮) সূর্য তার নির্ধারিত কক্ষপথে চলমান।— (সুরা রহমান: ৫) সূর্য ও চাঁদ নির্ধারিত নিয়মে চলমান। এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, সূর্য আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত হয় এবং প্রকৃতির সবকিছুই একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীন।

সহিহ হাদিসে গরম সম্পর্কে নির্দেশনা

​রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: গরম ও ঠান্ডা উভয়ই আল্লাহর সৃষ্টি। — (সহিহ মুসলিম: ৬১৭) এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, তাপমাত্রা আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ।

​রাসুল (সা.) বলেছেন: তাপমাত্রা বেশি হলে নামাজ ঠান্ডা সময়ে আদায় করো। — (সহিহ বুখারি: ৫৩৩)

এই হাদিসে অতিরিক্ত গরমে মানবদেহের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

​রাসুল (সা.) বলেন: যখন তাপমাত্রা বেশি হয়, তখন জোহরের নামাজ ঠান্ডা সময়ে আদায় করো। — (সহিহ মুসলিম: ৬১৫) এখানে ইসলাম মানবস্বাস্থ্য রক্ষা ও কষ্ট লাঘবের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

কোন তাপমাত্রায় ঝুঁকি বেশি?

​চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে—

​৩৫°C এর বেশি এবং আর্দ্রতা বেশি হলে ঝুঁকি শুরু হয়

​৩৮–৪২°C তাপমাত্রায় হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়

​৪০°C এর বেশি তাপমাত্রা জীবনঘাতী হতে পারে। তবে শুধু তাপমাত্রাই নয়, বাতাসের আর্দ্রতা ও শারীরিক পরিশ্রমও ঝুঁকি বাড়ায়।

হিটস্ট্রোক ও মস্তিষ্কের ক্ষতি

​মস্তিষ্ক অত্যন্ত তাপ সংবেদনশীল অঙ্গ। অতিরিক্ত গরমে—

​স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যায়

​শরীরে লবণ ও পানির ঘাটতি হয়

​রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়

​ফলে অজ্ঞানতা, খিঁচুনি এমনকি মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

​প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে কিছু সতর্কতা জরুরি—

​দুপুর ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত রোদ এড়িয়ে চলা

​পর্যাপ্ত পানি পান করা

​ORS বা লবণ-চিনি পানি গ্রহণ করা

​হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা

​ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা

​অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কমানো

পরিশেষে

​পরিশেষে বলা যায়, মে–জুনের তীব্র গরম সূর্যের পৃথিবীর দিকে নেমে আসার কারণে নয়; বরং পৃথিবীর অক্ষের হেলন, সূর্যের কিরণের কোণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে।

​কোরআন সূর্যকে আল্লাহর নিয়ন্ত্রিত নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং সহিহ হাদিসে অতিরিক্ত গরমে সতর্কতা ও মানবস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানও প্রমাণ করে, হিটস্ট্রোক একটি মারাত্মক কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি।

​অতএব, ধর্মীয় শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান— উভয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমাদের উচিত সচেতন থাকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা এবং আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

ইমেইল: drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন