Logo

ধর্ম

​জাতীয় বাজেট

উপেক্ষিত কওমি মাদরাসা ও ইমাম-খতিবদের অধিকার

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৯

উপেক্ষিত কওমি মাদরাসা ও ইমাম-খতিবদের অধিকার

​সংসদে এখন চলছে বাজেট অধিবেশন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রাক-বাজেট আলোচনা ও সেমিনারের আয়োজন করছে। বাজেটের কোন খাতে কত বরাদ্দ, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই বাজেট পাস হওয়ার কথা। সাধারণ মানুষ হয়তো বাজেটের জটিল অর্থনৈতিক মারপ্যাঁচ বোঝে না; কিন্তু বাজেটের আগেই যখন বিদ্যুতের দাম বাড়ে, তখন তার আঁচ এসে পড়ে সাধারণের পারিবারিক জীবনে।

​স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই আমাদের জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ছে। এবারও প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল বাজেটেও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

কওমি মাদরাসার ঐতিহাসিক অবদান ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্য

​স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম একটি ধারা হলো কওমি মাদরাসা। দেশ ও জাতির নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে এ ধারার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলো যুগে যুগে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ইমাম, খতিব, মুফতি, মুহাদ্দিস ও আলেম-উলামা তৈরিতে এ শিক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে কওমি অঙ্গনের বহু আলেম ও ছাত্র জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও মহামারির সময় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও কওমি মাদরাসাগুলোর অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। এছাড়া সমাজে নৈতিকতা, মানবিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ওয়াজ-মাহফিল, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং জনসচেতনতামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই ধারাটি মূলত জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দান ও সাহায্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার স্বার্থে কখনোই সরকারের কাছে বিশেষ কোনো দাবি-দাওয়া করেনি।

​২০০৬ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতির লক্ষ্যে গেজেট প্রকাশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কওমি সনদের 'মাস্টার্স সমমান' দেওয়া হলেও, বাস্তবে কর্মসংস্থান বা অন্যান্য ক্ষেত্রে এই সনদের কার্যকারিতা এখনো দৃশ্যমান নয়।

​আজ দেশের আলিয়া মাদরাসা, স্কুল ও কলেজগুলোতে সরকারি খরচে নান্দনিক ভবন তৈরি হচ্ছে; শিক্ষকেরা এমপিওভুক্তিসহ নানাবিধ রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ একমাত্র কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারাটিই রয়ে গেছে চরমভাবে বঞ্চিত। সরকারি বাজেট থেকে তাদের অবকাঠামো বা শিক্ষার মানোন্নয়নে এক পয়সাও বরাদ্দ দেওয়া হয় না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ যখন সব ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতার dream (স্বপ্ন) দেখছে, তখনো শিক্ষার এই বিশাল ধারার প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য টিকে রয়েছে।

দায়বদ্ধতার অভাব ও নীরবতা

​দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কওমি মাদরাসার শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল, শিক্ষাবোর্ডের নেতৃবৃন্দ কিংবা নবীন ওলামায়ে কেরাম—কারো পক্ষ থেকেই জাতীয় বাজেটে নিজেদের অধিকার বা বরাদ্দ নিয়ে কোনো জোরালো দাবি বা সেমিনারের আয়োজন করতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের এই বিশাল অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলার মতো সংসদেও কোনো বিশেষ প্রতিনিধি নেই। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের নানা ভাতা ও উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, শিক্ষার এই ধারার জন্য কোনো কথা বলেন না।

​অথচ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো জাতীয় সংকটে এই কওমি ধারার ছাত্র-শিক্ষকেরা সবার আগে রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। কিন্তু নিজেদের অধিকার আদায়ের বেলায় তারা যেন একপ্রকার লজ্জাবোধ বা জড়তায় ভোগেন।

ইমাম ও খতিবদের অর্থনৈতিক সংকট

​কওমি মাদরাসার আলেমদের মতোই একই কাতারে রয়েছেন দেশের প্রায় তিন লাখ মসজিদের ইমাম ও খতিবগণ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা জুমার মিম্বর থেকে প্রতিনিয়ত জোরালো বক্তব্য দেন। রাজপথে নানা জাতীয় ইস্যুতে তারা মুখর হলেও, নিজেদের অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে তারা নীরব।

​ঈদের আগে সরকারকে সীমিত আকারে কিছু ইমাম-খতিবকে সামান্য অনুদান বা কার্ড দিতে দেখা যায়, যা একপ্রকার খয়রাতি সাহায্যের সামিল। কিন্তু বাজেটে তাদের স্থায়ী মর্যাদা বা অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে না। অথচ অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও দুর্বল থেকে কখনো একটি সমাজ বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

সুনাগরিক গঠনে অবদান ও আমাদের প্রস্তাবনা

​মিডিয়ায় মাঝে মাঝে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখিয়ে মাদরাসার নামে অপপ্রচার চালানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুগ যুগ ধরে কওমি মাদরাসাগুলো লাখ লাখ দরিদ্র, অনাথ ও বিপন্ন শিশুকে নিখরচায় আবাসন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তারা সমাজকে কুরআন-সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করে সৎ, দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক উপহার দিচ্ছে।

কওমি মাদরাসাগুলো শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, আমানতদারিতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবসেবার চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে আলেম-উলামারা নিয়মিতভাবে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ফলে নৈতিক ও আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণে কওমি মাদরাসার অবদান অনস্বীকার্য।

​এই দেশ আমাদের, এই পতাকা আমাদের। দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্স ও ভ্যাটের টাকায় রাষ্ট্রের যাবতীয় উন্নয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। তাই কওমি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং দেশের ইমাম-খতিবদেরও রাষ্ট্রীয় বাজেটে অধিকার পাওয়ার পূর্ণ হক রয়েছে।

আমাদের সুস্পষ্ট কিছু প্রস্তাবনা

​১. কওমি মাদরাসার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং দেশের ৫টি শিক্ষা বোর্ডসহ অন্যান্য আলেম-ওলামাদের উদ্যোগে বাজেট পাসের আগেই দ্রুত একটি সেমিনার বা আলোচনা সভার আয়োজন করা হোক।

​২. কওমি শিক্ষার কারিকুলাম আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষক-ছাত্রদের অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা পেশ করা হোক।

​৩. দেশের তিন লাখ ইমাম ও খতিবদের কল্যাণে জাতীয় বাজেটে একটি স্থায়ী এবং সম্মানজনক বরাদ্দ রাখার দাবি তোলা হোক।

​এখন আর চুপ থাকার সময় নেই। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার এবং মিম্বর ও রাজপথ থেকে নিজেদের ন্যায্য দাবির পক্ষে সোচ্চার হওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।

লেখক: শায়খুল হাদিস, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন